Deprecated: Function get_magic_quotes_gpc() is deprecated in /customers/2/1/8/swadhindesh.com/httpd.www/bangla/wp-includes/load.php on line 651 Deprecated: Function get_magic_quotes_gpc() is deprecated in /customers/2/1/8/swadhindesh.com/httpd.www/bangla/wp-includes/formatting.php on line 4381 Deprecated: Function get_magic_quotes_gpc() is deprecated in /customers/2/1/8/swadhindesh.com/httpd.www/bangla/wp-includes/formatting.php on line 4381 Deprecated: Function get_magic_quotes_gpc() is deprecated in /customers/2/1/8/swadhindesh.com/httpd.www/bangla/wp-includes/formatting.php on line 4381 নির্বাচিত কলাম – Swadhindesh.com-স্বাধীনদেশ http://bangla.swadhindesh.com Leading Bangladeshi Online Newspaper Thu, 22 Aug 2019 16:45:35 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=4.9.15 নতুন বছরে কেমন হবে হাসিনা, খালেদা ও তারেকের ভাগ্য? http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%ac%e0%a6%9b%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%a8-%e0%a6%b9%e0%a6%ac%e0%a7%87-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%be/ Mon, 01 Jan 2018 14:00:44 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=86876 এম মাহাবুবুর রহমান

হ্যাপি নিউ ইয়ার! সবাই মূল্যায়ন করছেন নিজের জীবনে ২০১৭ কেমন ছিল। শুভ কামনা করেছেন ২০১৮ সালের জন্য। ফেসবুকের ইনবক্সে হাজারো ম্যাসেজ ইন-আউট হয়েছে এই কামনায়। অনেকেই ম্যাসেজগুলো পড়ার সুযোগ পাননি। এটাই বাস্তবতা। ব্যস্ত জীবনে এতো ম্যাসেজ পড়া যায় না। সত্যিই মানুষের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই চ্যালেঞ্জিং।

ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হলেও সব মানুষই চ্যালেঞ্জ নিয়েই জীবন পার করে। সেটা বিত্তবান কিংবা গরীব, মন্ত্রী কিংবা জনগণ, উন্নত দেশের বেনেফিট ফ্রডকারী কিংবা আমাদের দুর্নীতিবাজ নেতা বা চাকুরিজীবী, চোর কিংবা ডাকাত সবাই ভিন্ন স্টাইলের চ্যালেঞ্জের মধ্যেই থাকেন।

আবার, গরীব কিংবা ধনী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ভিন্নরকম চ্যালেঞ্জ থাকে প্রতিনিয়ত। তবে জনগণ যেভাবেই ভাবুক, শাসক গোষ্ঠীর এজেন্ডা বা চ্যালেঞ্জ অনেক সময় ভিন্ন থাকে। এটি নিয়ে আরেক দিন লিখবো। নতুন বছরের প্রথম দিনে প্রিয় মাতৃভুমি বাংলাদেশের জন্য ২০১৮ সালের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কিছু বলতে চাই। আমরা সবাই জানি, এই বছরটি বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জের। রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী ও সাধারণ মানুষের জন্য চ্যালেঞ্জটা একটু ভিন্ন রকম।

ধরুন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনার জন্য এ বছর নতুন চ্যালেঞ্জ কি? যেভাবেই হোক, জনগণের ভোট ছাড়াই ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখা!! এজন্য ইতোমধ্যে তিনি রোডম্যাপ তৈরী করে ফেলেছেন। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে ইতোমধ্যে দুর্নীতি মামলায় কনভিক্ট করার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। সেক্ষেত্রে ওই আদালতের বিচারপতির জন্য চ্যালেঞ্জ কি? শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার রায় দেয়া। আওয়ামী লীগের আইনজীবীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো তথ্য-উপাত্ত যুক্তি তুলে ধরা। আওয়ামী নেতাকর্মীদের দায়িত্ব হলো শেষবছরের (!) লুটপাটের পাশাপাশি সন্ত্রাসের মাধ্যমে সর্বত্র আধিপত্য বিস্তার করা। পুলিশের চ্যালেঞ্জ হলো পুরো প্রক্রিয়ায় লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করা। এভাবে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র কাজে লাগিয়ে নতুন এক পরিস্থিতির তৈরী করা হবে, যেখানে শেখ হাসিনা তাঁর দলের পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ে এক পক্ষে থাকবেন; আর অন্য পক্ষে থাকবেন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ও ভাঙ্গা ভাঙ্গা একটি রাজনৈতিক জোট!! এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার সব আয়োজন সম্পন্ন হবে ২০১৮ সালে।

এক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার চ্যালেঞ্জ কি? বেগম খালেদা জিয়ার জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো- তিনি মামলা ও দল কিভাবে সামাল দিবেন। যদি কারাগারে পাঠানো হয়, কিংবা নির্বাচনে অযোগ্য করা হয়; তখন কাকে দলের দায়িত্ব দেবেন? বিএনপির শীর্ষ এক নেতার সূত্রে জানতে পারলাম, বেগম খালেদা জিয়াকে অবশ্যই কারাদন্ড দেয়া হবে। গ্রেফতার দেখিয়ে বাসায় রাখা হবে। পরে জামিন দেয়া হবে। এই পরিস্থিতি সামলে নিতে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে বিশ্বস্ত ও সক্রিয় নেতা কে আছেন? বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থেকে মনোবল যোগানোর ব্যক্তিটি কে? না-কি এক-এগারোর মতো কিছু নেতা বিএনপি নিয়ে আবার ষড়যন্ত্র করবে? করতেই পারে। সেখানে বিএনপির বা বেগম খালেদা জিয়ার প্রস্তুতি কি?

প্রশ্ন উঠতে পারে, জনাব তারেক রহমান কী এই পরিস্থিতিতে দেশে ফিরবেন? আমার মতে, নির্বাচনী রোডম্যাপ ছাড়া তারেক রহমানের দেশে ফেরার সুযোগ নেই। ভিন্নমত থাকতেই পারে। লন্ডনে থাকার চেয়ে এমন এক পরিস্থিতিতে গিয়ে দেশে কারাগারে থাকা ভালো, এমন মন্তব্য অনেকেই করেন। আবার, অনেকেই বলেন, কারাগারে থাকার চেয়ে বাইরে থেকে দলকে সঠিক পথে রাখতে পারাটা বেটার। কেউ কেউ মত দেন যে, এমন দুর্দিন দেখা দিলে ডা. জুবাইদা রহমানের বাংলাদেশে ফেরা উচিত। পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে রাজনীতিতে সক্রিয় হবার কথা বলেন তারা। এটিরও সমালোচনা আছে। তবে আমার মতে, সবকিছুর জন্য একটি মানসিক প্রস্তুতি রাখা ভালো।

সত্যিকার অর্থেই, ২০১৮ সাল শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনের চুড়ান্ত ভাগ্য নির্ধারণের বছর। ধরুন, শেখ হাসিনা শক্তি ও টেকনিক প্রয়োগ করে টিকে গেলেন। তাহলে তিনি বাংলাদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়া বলে আর কিছু রাখবেন বলে মনে হয় না। যতোদিন বেঁচে থাকবেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাঁচবেন!!! আবার কোনো নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এ বছর তিনি অংশ নিলে প্রধানমন্ত্রী পদে আর এ জীবনে ফিরতে পারবেন না। এমনকি অনেক হয়রানির শিকারও হতে পারেন।

একইভাবে বেগম খালেদা জিয়া পরিস্থিতি সামলে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে না পারলে, বয়স ও শরীর বিবেচনায় ফের এ সুযোগ পাওয়া অনিশ্চিত। তারেক রহমানের জন্যও এ বছরটি চ্যালেঞ্জের। শতভাগ সক্ষমতা দেখিয়ে তাকে একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে। আশার বিষয় হলো- জনগণ চায় একটি পরিবর্তন। গণতান্ত্রিক সরকারের প্রত্যাশা জনগণের মধ্যে এখন বিরাজমান। প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ, প্রফেশনালস্ এমনকি সেনাবাহিনীও ইতিবাচক পরিবর্তন চায়। বিএনপির দায়িত্ব হলো- সুপরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা।

এ পরিস্থিতিতে ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল দু‘টি পলিসি নিয়ে বিএনপিকে এগুতে হবে। এখন প্রথম কাজ হবে বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে সরকার যে ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছেন, তা মোকাবেলা করা। এজন্য তারেক রহমান কিংবা ডা. জোবাইদা রহমান একজনের দেশে ফেরা জরুরী। এবং অবশ্যই সেক্ষেত্রে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে সবসময় শলাপরামর্শ করা জরুরী। কোনো ভায়া হয়ে নয়, নিজেই এসব দায়িত্ব পালন করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। মনে রাখতে হবে, ক্ষমতার চেয়েও দলের সাসটেইনিবিলিটি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য নেতাকে কৌশলী হতে হয়। অন্যথায়, দলের মধ্যে বিভ্রান্তকারীরা সুযোগ নেবেন। অনেকে না বুঝেই লম্ফঝম্ফ করবেন, আর শেখ হাসিনা মুচকি হেসে নতুন স্টাইলের এক সরকার গঠন করে ফেলবেন!!

বলে রাখা ভালো, ২০১৮ সাল বিএনপির তৃনমূল নেতাকর্মীদের জন্য বড় এক পরীক্ষা। যেমন ঐক্য, সাহস ও শৃঙ্খলা জরুরী; তেমনি বুঝেশুনে সঠিক দায়িত্ব পালনও অত্যাবশ্যক। এক্ষেত্রে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব, ছাত্রদলকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো দরকার। কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ সহ সারাদেশে যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি দেয়া উচিত। যেসব জেলায় বিএনপির কমিটিতে বিশৃঙ্খলা চলছে, কিংবা সক্রিয় নেই, সেদিকে নজর দেয়া জরুরী। জানুয়ারীতেই কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সভা ডাকা খুবই জরুরী।

আশা করি, বিচক্ষণ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেবেন। ইতোমধ্যে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় টিম জেলায় জেলায় পাঠিয়েছেন। এখন বিএনপি পন্থী পেশাজীবীদের ঐক্য নিশ্চিত করা আরো জরুরী। আর বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাহচর্যে যারা কাজ করেন; তাদের বিচক্ষণতা, বিশ্বস্ততা, রাজনৈতিক জ্ঞান ও দূরদর্শিতা এবং দায়িত্বশীলতা বাড়ানো অত্যাবশ্যক। কারন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আপনাকে এসব টুলস্ কাজে লাগাতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির যে দায়িত্ব জিয়া পরিবারের ওপর নির্ভর করছে, তা সফলভাবে পালন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।

পাঠক, একটু অধৈর্য লাগছে বটে। হেডলাইনে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জের কথা বললেও কেন কেবল দুইটি পরিবারের চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আমরা সীমাবদ্ধ থাকছি। এক্ষেত্রে আমি রাষ্ট্রদার্শনিক প্রফেসর ড. তালুকদার মনিরুজ্জামানের মতামতকে প্রাধান্য দিতে চাই। মুজিব ও জিয়া পরিবার কেন্দ্রীক দুই রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব না থাকলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। গত কয়েক বছরে বিএনপির কিছুটা দুর্বলতায় আপনারা বাংলাদেশের বর্তমান সার্বভৌমত্ব পরিস্থিতি দেখতেই পারছেন। এটা আসলেই বাস্তবতা।

তাই এই দুই পরিবারের চলমান নেতিবাচক চ্যালেঞ্জকে আমরা জনগণ ইতিবাচক পথে আনার চেষ্টা করতে পারি। এটাই হলো জনগণের চ্যালেঞ্জ। চালের দাম, পিঁয়াজের দাম, লবনের দাম কমাতে হলে দুর্নীতি ও লুটপাট কমাতে হবে। এজন্য এই দুই দলতে আপাততঃ জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচিত একটি সরকার নিশ্চিত করতে পারলে জবাবদিহিতা কিছুটা হলেও সম্ভব। ২০১৮ সালে একটি জবাবদিহি সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা আমাদের সবার চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ। আসুন, আমরা এই চ্যালেঞ্জে যে যার অবস্থান থেকে ভুমিকা রাখি। হ্যাপি নিউ ইয়ার ২০১৮। আপনাদের জীবন শুভ হোক।

]]>
একজন কিশোর মুক্তিযোদ্ধার চোখে ১৯৭১ http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9c%e0%a6%a8-%e0%a6%95%e0%a6%bf%e0%a6%b6%e0%a7%8b%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0/ Thu, 21 Dec 2017 10:14:50 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=86113 আবদুল কাদির সালেহ


২০১৭ সালের বিজয় দিবস চলে গেছে কিন্তু কথাগুলো যায়নি । নয়মাসের যুদ্ধ সব জায়গায় একই ভাবে হয়নি । একেক জায়গার অভিজ্ঞতা একেক রকম । এই অভিজ্ঞতা আবার ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে ভিন্ন । মুক্তিযুদ্ধ একটা বিশাল ব্যাপার । যারা রণাঙ্গনে ছিলেন , যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন , যারা একে সমন্বয় করেছেন , যারা বাঁধার পাহাড় কেটে একে লক্ষ্যাভিমুখী রেখেছেন , যারা পরাশক্তির থাবার সম্মুখে রুখে দাঁড়াবার জন্যে যুব জনযুদ্ধের প্রেরণা ও সাহস যুগিয়েছেন তাঁদের ত্যাগ এবং এর গল্প অনি:শেষ , অবর্ণনীয় ।

আমি বলতে চেয়েছিলাম জানা ও জনপ্রিয় গল্পের বাইরেও কিছু গল্প রয়ে যায় তারই তৃণ সম একটি অধ্যায়ের কথা । যেখানে আমি হেন নিতান্ত এক হিসাব অযোগ্য কিশোরের মুক্তিযোদ্ধা হয়ে উঠার কথা। আমি যেদিন থেকে ছাত্র ইউনিয়ন মাদ্রাসা শাখার সভাপতি হিসেবে ব্রাম্মনবাড়ীয়া জেলা কমিটি থেকে কার্ড পেলাম সেদিন মনে হোল আমি ঘর থেকে আঙিনায় এসে দাঁড়ালাম ।এতদিন শুধু শেখানো শ্লোগান দিয়েছি । তার উদ্দশ্য কী তেমন বুঝতাম না । এখন একটা লক্ষ্য পেয়েছি । ঐক্য শিক্ষা শান্তি প্রগতি । বাহ চমৎকারতো ! এখন মনে হলো আমি আমার আঙিনা থেকে উঠোন দেখতে পাচ্ছি । আকাশের নীলিমাও স্পর্শ করছে আমাকে ।

সৈয়দ শাহজাদা একদিন আমাকে পাঠালেন স্থানীয় ন্যাপ এর অফিসে । আমাদের বাড়ী গ্রামে হলেও এর অবস্থান ছিল বাজার ঘেষে । ন্যাপের নয়াপাড়া অফিস ছিল আমাদের বাড়ী থেকে কয়েকশ’ হাত পেছনে বজারে া গুরস্থান ঘেষে মেইন রোডের উপরে । আমি গেলাম ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ এর অফিসে । শাহজাদা গেলেননা । কারন তাঁর চাচা , চাচাতো ভাই সবাই মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন । তার চাচাতো ভাই সৈয়দ মুহাম্মদ কায়সার সত্তরের নির্বাচনে প্রাদেশিক পরিষদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ।

কেন তিনি ঐতিহ্যবাহী মুসলিমলীগ পরিবারের সদস্য হওয়া সত্তেও মুসলিম লীগ থেকে টিকিট নেননি বা পাননি তা সে বয়সে আমার জানা ছিলনা । তবে এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম যে তবুও তিনি মুসলিমলীগের ঐতিহ্যের ধারক । তাই শাহজাদা বাহিরে পারিবারিক ঐতিহ্যের খেলাফ কোন প্রকাশ্য কাজে জড়িত হতে চাইতেননা । আমি ন্যাপ অফিসে গেলাম । আমাকে দেখে তরুন ন্যাপ নেতা আনোয়ার চৌধুরী খুব আগ্রহ দেখালেন । কারন আমার দাদা ছিলেন এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী সালিশ এবং সর্দার ।

এলাকার বড় বড় বিচার সালিশ আমাদের বাড়ীর উঠুনে হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে হতো । তা ছাড়া ইতোমধ্যে নির্বাচনী ক্যানভাস এবং শ্লোগান দিয়ে আমি সামান্য একটা পরিচিতিও পেয়ে গিয়ে ছিলাম । দেশময় এ সময়টা ছিল খুবই গরম এবং অস্থির সময় । হঠাৎই শোনা গেলো পাক সেনারা শাহবাজপুর পর্যন্ত এসে গেছে । মুক্তিবাহিনী শাহবাজপুর ব্রিজ ভেঙ্গে দেয়ার কারনে সেখানে পান্জাবী সেনারা বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে এবং নির্বিচারে মানুষ মারছে । আমাদের নয়াপাড়া বাজারে এলাকার মুরব্বীরা গ্রামের সব পুরুষকে ডাকলেন । দুই ইউনিয়ন নয়াপাড়া ও জগদীশপুরের যুবক বৃদ্ধ রাস্তায় আসলো । সবাইকে বলা হলো রাস্তায় গাছ ফেলে ব্যরিকেড দিতে ।

সময়টা মার্চের শেষদিক ২৫ থেকে ৩০ শে র মধ্যে কোন একদিন হবে মনে করি । রাত ব্যাপী গাছ ফেলার কাজ হলো । নয়াপাড়া থেকে জগদীশপুর প্রায় দুই মাইল ব্যাপী ব্যারিকেড দেয়া হলো । এক ধরনের ভয় এবং উত্তেজনা নিয়ে আমি এবং আমার বয়েসীরাও এই যজ্ঞে এটা সেটা যোগান দিয়ে সহযোগিতা করলাম । ব্যরিকেডের পরদিন এলাকাব্যাপী আতংক এবং সুনসান নিরবতা দেখা দিল । অনেকেই পরিবার পরিজনকে দূরে অন্য কোথাও রেখে আসতে লাগলেন ।

আনোয়ার চৌধুরী ছাত্র জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতি করে জাতীয় রাজনীতিতে পা রেখেছেন । তাঁর বাড়ী আমাদের পাশের গ্রাম কড়রায় । এলাকায় তিনি তেমন সুবিধা করতে পারেননি । কারন আমাদের এলাকায় ছিল পাকিস্তান সাপোর্টাররা প্রতাপশালী । তো চৌধুরী চাচা এর মধ্যে একটা কৌশল করলেন । পাকিস্তান পন্থী এলাকায় কি ভাবে বাংলাদেশের পতাকা উঠানো যায় ! তিনি আমাকে অফিসে নিয়ে আড়াই তিন হাত লম্বা বাংলাদেশের পতাকা দিয়ে বললেন গ্রামের কিশোরদের নিয়ে এই পতাকা উঠিয়ে মিছিল দাও । তখন এতো ভয় আতংক এবং বৈরিতার মধ্যেও আমি দারুন এক উত্তেজনায় ভাসতে থাকলাম ।
(চলবে)

লেখক : অধ্যাপক মাওলানা আবদুল কাদির সালেহ, কিশোর মুক্তিযোদ্ধা
সাবেক সহযোগী সম্পাদক : দৈনিক আল মুজাদ্দেদ
চেয়ারম্যান : আল আমীন ফাউন্ডেশন ও স্কুল, বার্মিংহাম, ইংল্যান্ড
ইমেল : quadirsaleh@gmail.com

]]>
বিজয়ের মাসে যুদ্ধ দিনের কথা http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a7%9f%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a7%87-%e0%a6%af%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95/ Tue, 19 Dec 2017 09:43:59 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=85928  

আবদুল কাদির সালেহ

ছোট হওয়ার অসুবিধা যেমন আছে আবার সুবিধাও অনেক । সেদিন নয়াপাড়া এলাকায় বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন এবং মিলিটারী খতমের শ্লোগান দিয়ে মিছিল করতে আমি সেই সুবিধাটা পেয়েছিলাম ।

তার আগে ছোট হওয়ার কারনে বন্চিতও যে হয়েছি অনেক সে কথাটাই বলি এখানে ।  ৬৮ সালে আইয়ূব খানের বার্থ কন্ট্রোল আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী ব্যাপক আন্দোলন হয় । আমাদের মাদ্রাসার ছাত্ররা এ আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে । জিরুন্ডা গ্রামের মেহের উল্লাহ ভাই ছিলেন তখন মাদ্রাসা ছাত্র ইউনিয়নের সেক্রেটারী । সংগ্রামী মানুষ । আমাদের সিনিয়দের মধ্যেও ছিলেন সেই সময়ের একদল চৌকস ছাত্র নেতা ।

বেঙ্গাউতার কিতাব আলী ভাই, আমার চাচা আব্দুল ওয়াহহাব আফরোজ ,আমাদের গ্রামের আলী আহমদ ভাই, হরিতলার আব্দুল ওয়াহহাব ভাই ,ইটাখোলার আন্জব আলী ভাই ও লকুজ ভাই, বেঙ্গাউতার সুলতান ভাই , খড়কীর জিয়া উদ্দীন ভাই সহ আরো অনেকে । তারা গায়ে গতরে যেমন উঁচা লম্বা ছিলেন তেমনি সাহসী এবং সামাজিক যোহাযোগে বেশ চৌকস ছিলেন ।

একবার কর্মসুচী নেয়া হলো ছাতিয়ান বাজারে স্থাপিত বার্থ কন্ট্রোল অফিস ভেঙ্গে দেয়া হবে ।এ নিয়ে মিটিং হলো ।

বয়সে ছোট বিধায় তিন মাইল দূরের ছাতিয়াইন বাজারে মিছিল ও বিক্ষোভ যাত্রায় আমাকে নেয়া হলোনা । তারা গেলেন বিরাট মিছিল নিয়ে । বার্থ কন্ট্রোল অফিসার পালিয়ে গেলেন । পরে অবশ্য সরকার বার্থ কন্ট্রোল নাম পরিবর্তন করে ফ্যামিলি প্লানিং নামকরন করে ।

বিক্ষোভকারীরা অফিস ভাঙ্চুর করে , ঔষধ পত্র বিনষ্ঠ করে এবং অফিসের বিরাট সাইনবোর্ডটা খুলে সাথে করে মাদ্রাসায় নিয়ে এসে পেশাব খানার বেড়া হিসেবে ফিক্স করে ফেলে । পরদিন এই বে আইনী কাজ করার জন্য তাদেরকে প্রচন্ড মার খেতে হয় । ছোটরা আমরা যারা যেতে পারিনি তারা ছাড়া মাদ্রাসার সকল ছাত্র সেদিন দশটা করে কাঁচা কন্চির বেত্রাঘাত খেয়েছে ।

তাদের শপথ ছিল মার খাবো কিন্তু উহ্ করবোনা । অবশেষে তাই হয়েছে ।

তারা যখন ফিরতি পথে শ্লোগান দিচ্ছিল :

‘ ছাতিয়াইন ছাতিয়াইন -গিয়েছি গিয়েছি’ ।
‘ সাইনবোর্ড সাইনবোর্ড – ভেঙ্গেছি ভেঙেছি ‘।
‘অফিসারকে অফিসারকে – দৌড়াইছি, দৌড়াইছি’।
‘ পালাইছেরে পালাইছে – অফিসার পালাইছে ।
‘ ইসলামবিরোধী বার্থ কন্ট্রোল – মানিনা চলবেনা।
‘ আইয়ূব যদি বাঁতে চাও – গদ্দি ছাইড়া চলে যাও ।
‘ কানা মন্ত্রী ফজলুর রহমানের – ফাঁসি চাই দিতে হবে ।

আমার তখন আর আফসোসের সীমা থাকলোনা ।

এর কিছুদিন পর মহকুমা ব্যাপী বার্থ কন্ট্রোলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের কর্মসুচী নেয়া হয় । তখন মহকুমা বার্থ কন্ট্রোলের
হেড অফিস ছিল চুনারুঘাট সদরে । তখনও একই কারনে আমাকে নেয়া হয়নি । সারা মহকুমার মাদ্রাসা ছাত্ররা সেদিন জমায়েত হয়েছিল চুনারুঘাটে । পুলিশ খুব কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছিল । আমাদের মাদ্রাসা থেকে মেহেরুল্লাহ ভাই ও সুলতান ভাই সহ চারজন এরেস্ট হয়েছিলেন ।

আমার এই বাদ পড়া আমাকে আহত করতো ।

এর বেশ পরে ‘ ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানের টালমাটাল সময়ে
আইয়ুবখানের পদত্যাগ, ধর্মমন্ত্রী ড: ফজলুর রহমানের ফাঁসি
এবং আরও জাতীয় ও মাদ্রাসা ছাত্রদের দাবী সহ মোট আট দফা দাবী নিয়ে ঢাকায় গভর্ণর হাউস ঘেরাও কর্মসূচী রাখা হয় ।

সেখানেও আমাকে নেয়া হলোনা বয়স এবং সাইজে ছোট হওয়ার কারনে । আমি কিন্তু লুকিয়ে আমাদের ক্ষেতের আলু তুলে বিক্রি করে ১২/-টাকা জোগাড় করে রেখেছিলাম ।

গভর্ণর হাউস ঘেরাও হলো । ফজলুর রহমান অপসারিত হলেন । আইয়ুব খানও এক পর্যায়ে পদত্যাগ করলেন । আমার দু:খবোধ থেকে গেলো ।

আইয়ূবের বিরুদ্ধে এতো পোস্টার লিখলাম ; কিন্তু ঐ একই কারনে মূল কর্মসূচীতে আমার অংশ গ্রহনের
সুযোগ মিললোনা ।

( চলবে)

লেখক : অধ্যাপক মাওলানা আবদুল কাদির সালেহ ।
সাবেক সহযোগী সম্পাদক : দৈনিক আল মুজাদ্দেদ
চেয়ারম্যান : আল আমীন ফাউন্ডেশন ও স্কুল, বার্মিংহাম, ইংল্যান্ড
ইমেল : quadirsaleh@gmail.com

]]>
বিজয় দিবসে যুদ্ধদিনের কথা http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%9c%e0%a7%9f-%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%ac%e0%a6%b8%e0%a7%87-%e0%a6%af%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a6%a5/ Sun, 17 Dec 2017 09:50:52 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=85770

আবদুল কাদির সালেহ

১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস । নয় মাসের মুক্তি যুদ্বের পর আমরা লাভ করি একটি স্বাধীন সার্বভৌম পতাকা । কিন্তু সে পতাকাটা নির্মিত হয়েছিল বেশ আগেই । বিজয়ী বাঙালীর কাছে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানার প্রেক্ষাপটে ছাত্র জনতার মধ্যে টানটান উত্তেজনা ও বিদ্রোহ ফুঁসে উঠে । ২ রা মার্চ ঢাকা বিশ্বিদ্যালয়ের কলা ভবনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন তৎকালীন ছাত্রনেতা আ স ম আবদুররব । যুদ্বকালীন সময়ে আমি ছিলাম
১১ বছরের কিশোর ।

৬২ সাল থেকেই দেশ ছিল আন্দোলনে উত্তাল । ৬৭,৬৮ র আন্দোলনে বড় ভাইরা মাদ্রাসায় হরতাল ডেকে আমাদেরকে টেনে নিয়ে গেছেন মিছিলে । ৭ দফা এবং ১১ দফা আন্দোলনের পাশাপাশি মাদ্রাসা ছাত্ররা করতো ৮ দফার আন্দোলন । মনে পড়ে সেই সময় প্রায় প্রতিদিনই ক্লাস বন্দ করে বড় ভাইরা আমাদেরকে মিছিলে নিয়ে যেতেন । আমার হাতের লিখা সুন্দর ছিল । মিছিলের পোস্টার লিখার দায়িত্ব দিতেন আমাকে । বাঁশের কলম দিয়ে লিখতাম মতিন ভাই আলাউদ্দীন ভাই( ভাষা সৈনিক) মুক্তিচাই দিতে হবে । মোদের দাবী মানতে হবে নইলে গদী ছাড়তে হবে । আইয়ূব মোনায়েম ভাই ভাই এক দড়িতে ফাঁসি চাই ।

আন্দোলনের গোড়ার্থ তখন তেমন না বুঝলেও মুলত এই সব মিছিল আর পোস্টার লিখা আমার মধ্যে একধরনের দ্রোহী চঞ্চলতা তৈরী করে । মাঝে মধ্যে দু একটা ছাপা লিফলেট আসতো ঢাকা থেকে । আমি বাড়ী ফিরে এ গুলো মুখস্ত করতাম আর বাড়ীর পাশে নয়াপাড়া চা বাগানে গিয়ে চারা গাছ গুলোকে শ্রোতা বানিয়ে মুখস্ত বক্তৃতা ঝরাতাম । এ ভাবে একদিন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলো ।

২৫ মার্চে ঢাকা ক্রেকডাউনের পরে আর্মিরা বাড়ীঘর জালিয়ে অগ্রসর হতে থাকে। আমাদের বাড়ী ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সুতিকাগার তেলিয়াপাড়ার আড়াই মাইল দুরত্বে । চারদিকে আতংক । হঠাৎ করেই বিকট শব্দে ডিনামাইট ফুটলো তেলিয়াপাড়ার অনতিদূরে ।মানুষ আতংকে গ্রাম খালি করে যে যেভাবে পারে পালাতে লাগলো । পরে খবর আসলো এটি পাকিস্তান আর্মির কাজ নয়।

এদের অগ্রযাত্রা ঠেকাবার জন্য আমাদের বাড়ী থেকে ৭ মাইল দূরের শাহবাজপুর ব্রীজ উড়িয়ে দিয়েছে মুক্তিবাহিনী ।  মানুষ বাড়ী ঘরে ফিরে আসলো বটে কিন্তু আতংকটা উৎকন্ঠার রূপ নিলো । কারন যেখানেই মুক্তিবাহিনীর তৎপরতার সন্ধান পায় সেখানেই পাক আর্মিরা খুব নির্মম প্রতিশোধ নেয় ।

এরই মধ্যে আমাদের এলাকার পাকিস্তান গণ পরিষদের সাবেক সেক্রেটারী সৈয়দ সঈদ উদ্দীন সাহেবের ভাতিজা ব্রাম্মনবাড়ীয়া কলেজের ছাত্র সৈয়দ শাহজাদা আমাকে বললেন , তোমরা মাদ্রাসায় যে স্টুডেন্ট ইউনিয়ন কর যার তুমি সেক্রেটারী আমিওতো একই দল করি । তবে আমারটা এটা স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় মাদ্রাসায় সর্বত্র । সারা পাকিস্তানব্যাপী । ঐক্য শিক্ষা শান্তি প্রগতির জন্য আমরা কাজ করি । নাম বাংলায় ছাত্র ইউনিয়ন – ঠিক ক তোমাদের স্টুডেন্ট ইউনিয়নের বাংলা নাম ।

উল্লেখ করা যেতে পারে , মিছিলে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার জন্য মাদ্রাসায় তিন ক্লাস জুনিয়র থাকা অবস্থায় আমি মাদ্রাসা স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সেক্রেটারী নির্বাচক হই । সৈয়দ শাহজাদা বললেন, তুমি আমাদের সাথে জয়েন করো । আমি জয়েন করলাম । তিনি ক’দিন পর আমাকে একটা ছাপা কার্ড এনে দিলেন । তাতে আমার নাম লিখা মোহাম্মদ আব্দুল কাদির ( ছালেহ)
সভাপতি ইটাখোলা জুনিয়ার মাদ্রাসা শাখা । (চলবে )

পরবর্তি অংশ : আমার এলাকায় স্বাধীনতার প্রথম মিছিল ও পতাকা উত্তোলন ।

লেখক : অধ্যাপক মাওলানা আবদুল কাদির সালেহ ।
সাবেক সহযোগী সম্পাদক : দৈনিক আল মুজাদ্দেদ
চেয়ারম্যান : আল আমীন ফাউন্ডেশন ও স্কুল, বার্মিংহাম, ইংল্যান্ড
ইমেল : quadirsaleh@gmail.com

]]>
ইনুর সহী ফতোয়া : হাসিনার সাথে বেগম জিয়ার তুলনা  হয়না http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a6%87%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%b9%e0%a7%80-%e0%a6%ab%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%be/ Sat, 16 Dec 2017 00:13:06 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=85792 মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন

সাবেক তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদার কথা অনেকেরই মনে থাকার কথা। বেফাঁস ও বাজে কথা বলার জন্য এক সময় তাকে বেহুদা বলা হতো।  অনেকই মনে করেন চেষ্টা-তদবির এবং অনুনয়-বিনয়ের পর তথ্যমন্ত্রী হয়ে হাসানুল হক ইনু অযথা বাক-পটুতায় এবং বাজে শব্দ প্রয়োগে নাজমুল হুদাকেও ছাড়িয়ে গেছেন। শেখ হাসিনাকে খুশি করে তার নেক-নজরে থাকতে চাটুকারিতার পাশাপাশি ইনু প্রায়ই অবান্তরভাবে বেগম খালেদার বিরুদ্ধে উস্কানীমূলক কটূবাক্য  ব্যবহার করেন। এ ধরনের অর্বাচীনমূলক বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য শেখ হাসিনাকে খুশি করা। কিন্তু ১৬ নভেম্বর ঢাকা’র সংবাদ সংস্থা ‘ইউএনবি’ কার্যালয়ে একটি অনুষ্ঠান উদ্বোধনকালে ইনু হঠাৎ বেগম খালেদা জিয়াকে হেয় করতে দিয়ে তিনি যে বাক্য ব্যবহার করেছেন, তাকে আমি খালেদার সপক্ষে অতি বাস্তব ও ঐতিহাসিক মন্তব্য বলে মনে করি। ইনু বলেছেন, শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়াকে এক পাল্লায় মাপবেন না ।

এমন সহী কথা ইনুর মুখ দিয়ে বের হবে  – তা ভাবাই যায় না। এ ধরনের সহী মন্তব্যের জন্য ইনুকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। শেখ হাসিনার মতো খালেদা জিয়া সুবিধা মতো কথা পাল্টান না। প্রথম দফা প্রধানমন্ত্রী হবার পর শেখ হাসিনা বলেছিলেন তার বয়স ৫৬ বছর হলে তিনি রাজনীতি হতে অবসর নিবেন। এখন তার বয়স ৭০ বছর ছাড়িয়ে গেছে।  অবসর নেয়ার খবর নেই। মনে হচ্ছে আমৃত্যু রাজনীতি করবেন। অর্থাৎ নিজেই নিজের ঘোষণাকে মিথ্যে প্রমাণ করেছেন। এমন রেকর্ড বেগম জিয়ার নেই।

১৯৯২ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হবার পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিচারপতি বজলুল হায়দার চৌধুরীকে সমর্থন করার জন্য শেখ হাসিনা জামায়াতের তৎকালীন আমীর অধ্যাপক গোলাম আজমের শরণাপন্ন হন। গোলাম আজমের দোয়া কামনা করেন। বেগম জিয়া কখনোই তেমন ভূমিকায় অবতীর্ণ হন নি। শেখ হাসিনা গোলাম আজমের তত্ত্বাবধায়ক থিওরী গ্রহণ করে জামায়াতকে সাথে নিয়ে তত্তাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে হরতাল অবরোধসহ আইনবিরোধী পন্থায় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে দিয়ে জনতার মঞ্চের নামে দেশ অচল করে দেয়ার উদ্যোগ নেন। হরতালের নামে সড়কদ্বীপের গাছও শেখ হাসিনার লড়াকু সৈনিকদের হাত থেকে রক্ষা পায় নি।  হরতালের সময় পায়ে হেটে সচিবালয়গামী কর্মকর্তাকে সম্পূর্ণরূপে উলঙ্গ করে সড়কে বসিয়ে রাখার দৃশ্য মানুষকে হতবাকই নয় মর্মাহত হবার দৃশ্যও দেশ হাসিনা দেশবাসীকে উপহার দিয়েছেন। সব গাছ শেখ হাসিনার  শেখ হাসিনার দাবি অনুযায়ী নির্বাচনে  তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি বেগম জিয়া মেনে নিয়ে শাসনতন্ত্রের অনুর্ভূক্ত করা হলেও ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা বিচারপতিকে ব্যবহার করে তত্তাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করালেন।  বেগম জিয়া কখনোই এ ধরনের দ্বিচারিতা কিংবা ডিগবাজিমূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হননি।

মুন সিনেমা হলের মালিকানা নিয়ে দায়ের করা মামলার রায়ে দিয়ে গিয়ে শেখ হাসিনার নির্দেশে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক পন্থায় সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ৭৫-পরবর্তী সব শাসক ও আইনকে অবৈধ ঘোষণা করলে শেখ হাসিনা তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে অভিনন্দন জানান। রায়টি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করলে তাকে যারপরনাই অপমান করা হয়। তিনি অসুস্থ না হলেও জোরপূর্বক ছুটির নামে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ আনা হয়।

প্রথম দফা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দায়িত্বহীন ও বেফাঁস বক্তব্যের জন্য সর্বোচ্চ আদালত থেকে শেখ হাসিনাকে রং-হেডেড লেডি হিসেবে অভিহিত করা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পছন্দমতো রায় প্রদান না করায় হাইকোর্ট অঙ্গনে বস্তীবাসীদেরকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। হাইকোর্টের সামনে লাঠিমিছিল করা হয় এবং তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, লাঠি কোথায় মারতে হয় আওয়ামী লীগ তা জানে।

দ্বিতীয় দফা ক্ষমতা দখলের পর শেখ হাসিনা বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ দলীয় প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেন । নিজের এবং দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে রুজুকৃত খুনের মামলাসহ সাড়ে আট হাজারের মতো মামলা প্রত্যাহার করে নিজেদেরকে ধোয়া তুলসী পাতা হিসেবে জাহির করার উদ্ভট পন্থা গ্রহণ করলেন। আর বেগম খালেদা জিয়াসহ বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। এসবই শেখ হাসিনার সুবিধাবাদী অপকর্ম ঢাকার কারসারি।

শেখ হাসিনার মতো বেগম জিয়া বিচার বিভাগসহ প্রশাসনের সর্বত্র দলীয় ক্যাডারদেরকে নিয়োগ দেন নি। দলীয় ক্যাডারকে বিচারাধীন খুনের মামলার এক নম্বর আসামীকে হাইকোর্টের  বিচারপতির পদে বসান নি। ফাঁসির দন্ডাদেশপ্রাপ্ত ২০ আসামীকে দলীয় বিবেচনায় ক্ষমার মাধ্যমে দন্ডাদেশে পুরোপুরি মওকুফ করেন নি।

অন্যায্য দাবি আদায়ের নামে হারতাল, রাস্তাঘাট অবরোধ, যানবাহন ধ্বংস, শিল্পকারখানায় অগ্নিসংযোগসহ সারা দেশকে অচল করে  শেখ হাসিনা দলীয় ক্যাডারদেরকে লগি-বৈঠাসহ ঢাকায় আগমনের নির্দেশ দেন। এককালের পেয়ারে দোস্ত জামায়াতে ইসলামীর একেবারে নির্দোষ অনুসারীকে নির্দয়ভাবে লগিÑবৈঠা দিয়ে প্রকাশ্যে পিটিয়ে করা হয়। খালেদা জিয়ার এমন কালিমালিপ্ত নির্মমতার রেকর্ড নেই।

বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে কখনোই বহুরূপী সাজেন নি। খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার মতো কখনো কোন অনুষ্ঠানে গান গান নি; কখনো কাঁদেন নি কিংবা কখনো অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন নি । বেগম জিয়া কখনো তেঁতুল হুজুরদের অজানা সংখ্যক ঘুমন্ত অনুসারীকে সড়ক বাতি নিবিয়ে হত্যা করেন নি, আবার তেঁতুল হুজুরের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পনও করেন নি। হাইকোর্টের সামনে মূর্তি বসিয়ে আবার মূর্তি-বিরোধী বক্তব্য দিয়ে জাতিকে বিস্মিতও করেন নি। হিন্দু-দেবী গজে চড়ে এসেছে  (?) বলে দেশে বেশি ধান জন্মেছে এমন অর্বাচীন মন্তব্য ও খালেদা জিয়ার মুখে শোনা যায় নি।

শেখ হাসিনা হরতাল-অবরোধ করে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে হাসিনা সংসদে দাঁড়িয়ে হরতালের ক্ষতিকারক দিকগুলো তুলে ধরে বিএনপি’র ডাকা হরতালের নিন্দা করেন এবং বলেন আওয়ামী লীগ আর কখনোই হরতাল করবে না, এমনকি বিরোধী দলে গেলেও নয়। অথচ জাতিকে হতবাক করে ২০০১ সালে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে শেখ হাসিনা ১৭৩ দিন হরতাল করে নিজে পুনরায় অসত্যবাদী হিসেবে প্রমাণ করলেন । অর্থাৎ শেখ হাসিনা তার সুবিধামাফিক তার সুর পাল্টান।

হরতাল-অবরোধের নামে ঢাকাসহ সারা দেশকে অচল করে দেয়া হলেও খালেদা জিয়া কখনোই শেখ হাসিনার বাসা কিংবা অফিসের সামনে বালির ট্রাক ইটের ট্রাক দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে নি। পুলিশ বেস্টনী দিয়ে শেখ হাসিনাকে অঘোষিত গৃহবন্দি করেন নি। শেখ হাসিনাকে তার বাসগৃহ হতে একেবারে বেআইনীভাবে উচ্ছেদও করে নি।

ডিগবাজিতে শেখ হাসিনা অবশ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ। স্বৈরাচারী এরশাদের অধীনে যে নির্বাচন করবে সে জাতীয় বেঈমান হবে এমন ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা নিজেই এরশাদের অধীনে নির্বাচন অংশ নেন। আর বেগম জিয়া সে নির্বাচন বর্জন করেন। জাতীয় বেঈমানে কে, শেখ হাসিনা তা নিজেই প্রমাণ করেছেন । আবার ২০১৪ সালের ভুয়া নির্বাচনে সেই স্বৈরাচারী এরশাদকেই ঘুষ দিয়ে প্রহসনের নির্বাচনে  নামিয়েছেন।

খালেদা জিয়া গণতন্ত্রকে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেন নি। সরকারের সমালোচক সংবাদপত্র কিংবা টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেন নি।  সাংবাদিকদেরকে গণহারে নির্যাতন ও কারারুদ্ধ করেন নি। বাইরে কিংবা নিজগৃহে সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যা করা হয় নি।  বিনাভোটে ৩০০জন এমপির মধ্যে বিনাভোটে ১৫৪জনকে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় নির্বাচিত করে ভোট ছাড়াই সরকার গঠনের অগ্রিম ব্যবস্থা করেন নি। বাকি ১৪৪ আসনে কোনটিতেই ২০ শতাংশ ভোটার ভোট দেন নি। কোন কোন ভোটকেন্দ্রে একজন ভোটারও  যান নি। খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের নামে একব্যক্তির স্বৈরশাসন দেশে চালু করেন নি। শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের নামে দেশে অঘোষিত একদলীয় একব্যক্তির শাসন চাপিয়ে দিয়েছেন।

খালেদা জিয়া কখনো দেশ থেকে পালিয়ে যান নি । ভারতে কিংবা অন্যদেশে তথাকথিত স্বেচ্চানির্বাসনের নামে বিদেশীদের অর্থে পোষিত হন নি। মঈন ফখরুদ্দিনের উত্থানের সড়ক তৈরি করেন নি। ঢাকা শহরে লগি-বৈঠা আনেন নি। ফখরুদ্দিনের শপথানুষ্ঠানে খালেদা জিয়া অংশ গ্রহণ করেন নি। গণভবনে হাসিনার মতো হাসির রোল তোলেন নি। খালেদা জিয়া কখনো বলেন নি এ সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল, এ সরকারকে সফল করা আমাদের দায়িত্ব, এ সরকারের প্রতিটি কাজ ও কর্মসুচিকে আমরা সমর্থন  করবো কিংবা মেনে নেব। এসবই শেখ হাসিনার উক্তি।

বেগম জিয়া কখনোই জনসভায় বা ঘরোয়া আলোচনায় সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে শেখ হাসিনা কিংবা অন্যকোন নেতার বিরুদ্ধে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যমূলক অপমানজনক কথা  বলেন না, যেমনটি শেখ হাসিনা খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অহরহ বলে থাকেন।

অন্যদিকে ভারত কখনোই বলে নি যে, ভারত খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের ক্ষমতা দেখতে চায় কিংবা এমনও বলে নি যে, ভারত যেসব সুযোগ-সুবিধা বাংলাদেশ থেকে লুটে নিয়েছে সেগুলো ধরে রাখতে হলে খালেদা জিয়াকে আরো একবার ক্ষমতায় আনতে হবে। শেখ হাসিনার মতো খালেদা জিয়া কখনোই বিদেশে গিয়ে আশ্রয় নেন নি। কখনোই বিদেশীদের সহযোগিতায় ক্ষমতায় আসেন নি। শেখ হাসিনার ক্ষমতায় রাখার জন্য ভারতই প্রকাশ্যে একহাজার কোটি টাকা বাজেট করেছে, আর গোপনে কতো টাকা ব্যয় করেছে, সে খবর কেউ জানে না। ভারত প্রকাশ্যে বলেছে ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ক্ষমতায় দেখতে চায়। এতে বুঝা যায় শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছায় নয়, বরং ভারতের সহযোগিতায় ভারতের স্বার্থে ক্ষমতায় আসেন, ক্ষমতায় থাকেন।  এর মানে হলো শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার বিনিময়ে বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করেন, বাংলাদেশের নয়। আর খালেদা জিয়া বলেন: বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই।

প্রভু ভারতের নির্দেশেই শেখ হাসিনা সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করার আবরণে নদী-এলাকায় অবস্থিত আমাদের দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ তালপট্টি দ্বীপ ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছেন। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ট্রানজিট একচেটিয়া ব্যবসা এবং প্রকাশ্য ও গোপন চুক্তির বাংলাদেশকে ভারতের আশ্রিত রাজ্যে পরিণত করেছেন। এসব ক্ষেত্রে বেগম জিয়ার কোন ভূমিকা নেই। এগুলো তথাকথিত স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি শেখ হাসিনার দেশবিরোধী  কাজের অংশ বিশেষ । বাংলাদেশকে সবদিক থেকে শেষ করতে হলে শেখ হাসিনাকে বারবার ক্ষমতায় রাখতে তাই ভারত মরিয়া।

দেশজুড়ে বিভিন্ন অজুহাতে খুন-অপহরণ, গুম, বিডিআর বিদ্রোহের নামে নির্বিচারে সেনা কর্মকর্তা হত্যা, ব্যাংক, শেয়ার বাজার, রিজার্ভ চুরিতে বেগম জিয়ার কোন ভূমিকা নেই। তার সময় দেশের অর্থ এভাবে বিদেশে পাচার হয় নি। দেশের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত চোর আর ঘুষখোরে ভরে যায় নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আগুন জ্বলে নি। দেশের মানুষ এমন নিরাপত্তাহীনতায় অসহায়ত্বের মধ্যে দিনাতিপাত করেন নি। বাংলাদেশ এমন নেতৃত্বহীনতায় ভোগে নি। দেশের সবকিছু দেশের বাহির থেকে নির্ধারিত হয় দেশবাসী এখন আর দেশের মালিক নন। দেশের এমন দুর্দশার জন্য বেগম জিয়ার সামান্যতম ভূমিকা নেই।

বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় ইনু তার অজান্তেই বেগম জিয়া যে শেখ হাসিনার সাথে কোনভাবেই তুলনীয় নন তা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার সাথে বেগম জিয়াকে তুলনা করা যাবে না। আমরাও এ ক্ষেত্রে ইনুর সাথে একমত।*

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক, নিউইয়র্ক
Email: noa@agni.com

]]>
দেশের কুকুর ও ভিনদেশের ক্রীতদাস http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%ad%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%95%e0%a7%8d/ Mon, 27 Nov 2017 08:44:10 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=84547 ব্যারিস্টার আবু সায়েম

“পীর সাহেব মুরিদবিহীন একজন নি:স্ব মানুষ যিনি প্রচন্ড হতাশার মাঝে ডুবে আছেন।। আমি লক্ষ্য করেছি, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কথা বলে অনেকেই জাতে ওঠার চেষ্টা করেন।। পীরের ভাষায় ‘কুকুর’ হলেও তারা দেশেরই সন্তান, ভিনদেশী প্রভুদের কৃতদাস নয়।।”

লন্ডন নভেম্বর ২৬, ২০১৭: ইতিহাস কিন্তু ভিন্ন কথাও বলে, “আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারি কিন্তু আত্মপ্রতারণাও করতে পারি যখন নিজেদের মনোষ্কামনা পূরণ করতে আমরা অতীত থেকে সুবিধামতো সাবুদ উপস্থাপন করি।” মার্গারেট ম্যাকমিলানকে ধন্যবাদ তিনি ইতিহাস ফেরি করে বেড়ানো কিছু নকল মানুষের জন্য তার একটি লেখাতে উপযুক্ত এ উদ্ধৃতিটি ব্যবহার করেছেন।

যুদ্ধ, শান্তি ও ইতিহাসের ওপর মার্গারেটের অসাধারণ কিছু কাজ আছে, তবে ‘ইতিহাসের ব্যবহার ও অপব্যবহার’ শিরোনামে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণী অধ্যাপক ও সমকালীন সময়ের প্রখ্যাত এ ইতিহাসবিদের একটি লেখা বহুদিন আমার মনে গেঁথে থাকবে। অন্তর্গত দর্শনের বিবিধ বিষয়ে একমত না হলেও তার নৈর্ব্যক্তিক কিছু বক্তব্যের যথার্থতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।

The Uses and Abuses of History বইতে মার্গারেট লিখেছেন, “লোকেরা যখন ‘প্রকৃত’ ইতিহাসের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে, যেটি তারা বারংবারই করে, তখন তারা মূলত নিজেরা যে ইতিহাস চায় ও পছন্দ করে সেটিকেই বোঝায়।” তিনি আরও লিখেছেন, “ইতিহাস মানে অতীতকে স্মরণ করা, কিন্তু এটির আরেক অর্থ হচ্ছে আমরা যা ভুলতে চাই তা।” মার্গারেট ম্যাকমিলান রাশিয়া, চায়না, অ্যামেরিকাসহ আরও বহু দেশের উদাহরণ টেনে দেখিয়েছেন কালভেদে কীভাবে আসল ইতিহাসের বিকৃতি ঘটে। ইতিহাসকে তিনি ভৌগলিক ও সময়ানুক্রমিকভাবে পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রমাণের চেষ্টা করেছেন বিবেকবর্জিতদের হাতে ইতিহাস কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।

আমার আজকের লেখার উপজীব্য হালের এমনই এক বিবেকবর্জিত ইতিহাসবিদ যিনি সাধ ও স্বার্থের সংমিশ্রণে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক নসিহত করেছেন। আমরা চাইনি, কিন্তু তিনি গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল সেজে জানিয়েছেন, “ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেন না।”

ইতিহাস বলে, পীর হাবিবের স্বরূপ উত্থান ঘটেছিলো ১/১১’র অন্ধকার যুগে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে আমরা যখন দেশেবিদেশে লড়াই করছিলাম তখন মঈন-ফখরদের স্তাবক হয়ে ইতিহাস রচনায় ব্যস্ত ছিলেন স্বৈরাচার এরশাদের পরীক্ষিত এ গুণগ্রাহী। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে নিয়মিত লেখালিখি করতে গিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে তখন তুলাধুনা করলেও কৌশলে তিনি গায়ে আঁচড় পড়তে দেন নি এরশাদের।

২০১২ সালে এসেও পীর হাবিব এরশাদকে বাংলাদেশের ভবিষ্যত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। নিজস্ব কলামে পীর সাহেব তখন লিখেছিলেন, “গণঅভ্যুত্থানে পতিত সেনাশাসকরা দুনিয়ার কোথাও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি। এরশাদ এক্ষেত্রে বিরল। কারাগারে বসেই পাঁচটি করে আসনে বিজয়ী হয়েছেন দু’বার। তাকে জেলে নেওয়া হয়েছে। তাকে এবং পার্টিকে মামলায়-নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। দল ভেঙেছে দুবার। দল ছেড়ে চলে গেছেন অনেকে। তবুও তিনিই দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেতা। ইতিহাসের চাকাকে উল্টে দিয়ে এরশাদ জীবনের পড়ন্ত বেলায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে মসনদে ফিরতে চান।”

এতটা গুরুত্বের সাথে এরশাদকে নিয়ে আর কেউ কখনো লেখার সাহস দেখিয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনের বাজারে অপরিহার্য করে তুলতে এই সেদিনও পীর হাবিব কলম হাতে নিয়েছেন। ৪ নভেম্বর ২০১৭ সংখ্যার পূর্বপশ্চিম পত্রিকা ‘এরশাদকে রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টিকে ১০০ আসন: বিএনপির প্রস্তাব নিয়ে এক নেতা বেকায়দায়’ শিরোনামের প্রতিবেদন ছাপিয়ে বোঝাতে চেয়েছে, বিএনপি নেতৃত্ব এরশাদের সাথে গাঁটছড়া বাঁধতে মরিয়া কিন্তু এরশাদ তাতে সায় দিচ্ছে না! এতবড় মিথ্যাচারও কেউ করতে পারে? আজব বিষয় হচ্ছে, ‘বিশেষ প্রতিবেদক’র বরাত দিয়ে ছাপানো খবরটিতে না প্রকাশিত তথ্যের কোন উৎস বর্নণা করা আছে, না রয়েছে কোন বিশ্বাসযোগ্য রেফারেন্স। পীর হাবিবের মোটিভ বুঝতে সদ্যভূমিষ্ঠ একটি শিশুরও কষ্ট হওয়ার কথা নয়। আমি হলফ করে বলতে পারি, হালে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার পরম শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপিত করলেও পীরের আসল কিবলা ভিন্নমুখী।

মূলত পতিত স্বৈরাচার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকিয়ে রাখতেই পীরালি সাংবাদিকতার এ প্রাণান্তকর অধ্যবসায়। তিনি জানেন, জাতীয় পার্টির একমাত্র আশ্রয়স্থল হচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ‘মহাজোট’। কিন্তু সে জোটেও যথাযথ মূল্যায়ন পেতে হলে বাংলাদেশের রাজনীতির সর্বকালের সেরা ক্লাউনকে বিএনপি ও ২০দলীয় জোটের কাছে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। দরকষাকষির মজলিশে এরশাদ তখন তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসতে পারবেন আর আখেরে পীরেরও স্বার্থসিদ্ধি হবে। বলাবাহুল্য, এ কূটিল আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে এরশাদে নিস্পৃহ বিএনপিকেই সুড়সুড়ি দিতে হবে, পীরের তা অজানা নয়।

শখের ঐতিহাসিক পীর হাবিবুর রহমান তাই সম্প্রতি বিএনপি ও এ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে খোঁচাখুঁচি শুরু করেছেন। দিন গুনলে সামনে নির্বাচন, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা এখন মাইক্রোস্কোপের ছিদ্র দিয়ে পরিমাপ করতে হয়, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে ঘিরে প্রতিদিন বাড়ছে জনগণের বাঁধভাঙা উচ্ছাস-উদ্দীপনা, প্রশাসন-পুলিশ-সেনাবহিনীতে শিথিল হয়ে আসছে অনির্বাচিত সরকারের নিয়ন্ত্রণ, নিয়ম মানছে না কেউ – পরিস্থিতির এহেন ভয়াবহতায় পীরের চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ডুবন্ত নৌকা তথা ভাঙা লাঙ্গল বাঁচাতে তিনি তাই টার্গেট করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার এ মুহূর্তের সবচেয়ে দুই জনপ্রিয় ও আলোচিত রাজনীতিবিদ বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে।

বিএনপি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের ইতিহাসচর্চা পীরের ভালো লাগে নি। তারেক রহমান ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত দ্বারা প্রমাণ করেছেন, জিয়াউর রহমানই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। গালিগালাজে জর্জরিত করলেও আজব্দি তার দাবীকে কেউ গঠনমূলক সমালোচনায় চ্যালেন্জ করতে পারে নি। কিন্তু এতেই ভীষণ গোস্বা হয়েছেন পীর সাহেব। রাষ্ট্রপিতা শহীদ জিয়াউর রহমানকে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও প্রথম প্রেসিডেন্ট মানতে একেবারেই নারাজ। ২২ নভেম্বর ২০১৭ তারিখে বাংলাদেশ প্রতিদিনে ‘তারেক বিএনপির বোঝা না আওয়ামী লীগের শত্রু???’ শিরোনামে প্রকাশিত লম্বা একটি নিবন্ধে তিনি তীব্র বিষোদগার করেছেন তারেক রহমান সম্পর্কে। পীর ফতোয়া জারি করেছেন, তারেক রহমান দল ও দেশের রাজনীতির জন্য ‘বোঝা’ এবং প্রকারান্তরে বিএনপি নেতাকর্মীদের উস্কানোর চেষ্টা করেছেন যেন তারা তারেক রহমানকে বাদ দিয়েই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।

যেসব অশ্রাব্য বিশেষণে পীর হাবিব ২২ তারিখের লেখায় তারেক রহমানকে আক্রমণ করেছেন রেফারেন্স হিসেবেও সেগুলোর পুনরুক্তি করা শিষ্টাচারবহির্ভূত। তবে পীর যদি কেবল তারেক রহমানের বিরুদ্ধেই লিখতেন তাহলে হয়তো আমি তার প্রত্যুত্তরে যেতাম না। আমি লক্ষ্য করেছি, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কথা বলে অনেকেই জাতে ওঠার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশ ও বিএনপির ভবিষ্যৎ কর্ণধারকে জড়িয়ে একটু প্রলাপ বকলে বা খানিকটা মাতলামো করলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা যায়, সুতরাং গুটিকতক খোজা মানব এর সুযোগ নেবে তাতে আর সন্দেহ কি।

ভার্চুয়াল পোর্টালের যুগে যার যখন খুশি যা ইচ্ছে লিখে ফেললে জবাবদিহি করতে হয় না, পীর হাবিবও তা-ই করেছেন। সেসবে আমার এতটুকু আগ্রহ নেই। কিন্তু পীর সাহেব তিনদিন পর অর্থাৎ ২৫ নভেম্বর তার পূর্বপশ্চিমে আবারও দোয়াত খুলে বসেছেন এবং এবার তিনি তারেক রহমানের অনুসারীদের ‘প্রভুভক্ত পোষা কুকুর’ বলে অভিহিত করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। তথাপিও যদি চুপ মেরে থাকি, যদি সত্য প্রকাশে তারপরও ইতস্তত করি, তাহলে নিজের বিবেকের কাছেই অপরাধী বনে যাবে, তাই কলম হাতে নিয়েছি। ইতিহাস যে একপেশে হয় না, ইতিহাসের যে এপিঠ-ওপিঠ দু’পিঠ থাকে তা পীর সাহেবদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতেই আমার এ লেখার অবতারণা।

২২ নভেম্বর ও ২৫ নভেম্বরের দু’দুটি লেখায় পূর্বপশ্চিম সম্পাদক পীর হাবিবুর রহমান অজস্র তীর ছুঁড়েছেন জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান দিকে। তবে বোধগম্য কারণেই তার সর্বাধিক তীরের লক্ষ্যবস্তু ছিলো বিএনপির সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। কিন্তু উদ্ভূত সকল মিথ্যাচারের যথাযথ উত্তর দিতে গেলে এবং ইতিহাস বিনির্মাণে পীরের আনাড়িপনা অথবা চতূরতার বিস্তারিত বর্নণা দিতে হলে এ লেখা তার স্বাভাবিক গতি হারাবে। আমি তাই তার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেই আজ নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখবো। বাকি বিষয়গুলোতে আশা করি ভিন্ন কোন সময়ে কথা বলা যাবে।

পীরালি ব্যাখ্যামতে, রাষ্ট্রপিতা শহীদ জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নি এবং তিনি বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্টও ছিলেন না। আরও সহজভাবে তার দাবি হচ্ছে, মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক এবং তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার যিনি শেখ মুজিবের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছেন কেবল। শেখ মুজিবুর রহমানের সীমাতিরিক্ত বন্দনা করতে গিয়ে পীর সাহেব লিখেছেন, “১৯৭১-এর পরাজিত বিশ্বমোড়লদের দলিল-দস্তাবেজ, নথিপত্রেও এ দেশের স্বাধীনতার মহানায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথাই ঠাঁই পেয়েছে, আর কারও কথা আসেনি।”

প্রয়াত শেখ মুজিব আমাদের স্বাধীনতার ‘মহানায়ক’ কিনা কিংবা তার ডাকেই স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো কিনা অথবা আদৌ তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন কিনা বা কমের পক্ষে কখনো তা চেয়েছিলেন কিনা সে বিতর্কের সূত্রপাত এখানে আমি করবো না। কারো কারো চোখে তিনি যদি মুক্তিযুদ্ধের মহানায়কও হন তাতে আমার বাদ সাধতে যাওয়াটা এ লেখার স্বার্থে নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু ইতিহাসের চুলচেরা পোস্টমর্টেম যদি ভিন্ন কিছু বলে আমার তখন নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় সেটা জনগণের কাছে তুলে ধরা। দেখা যাক, শুদ্ধ ইতিহাস আমাদের কী শেখায়।

এটা সর্বজনবিদিত যে, পীর হাবীব অন্ধ ভারতপূজারী একজন সাংবাদিক। প্রতিবেশী বৃহৎ দেশটির প্রতি তার বিশেষ অনুরক্ততার কথা কে না জানে? ২০১২ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, “বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারত ঐতিহাসিকভাবে আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত হেঁটেছে উদার গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পথে… ভারত আজ দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করা চতুর্থ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র… প্রতিকূল বৈরী স্রোতের বিরুদ্ধে জনগণের অব্যাহত সংগ্রামে বাংলাদেশ হাঁটছে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক পথে। আঘাত নানা সময়ে এলেও পথহারা হয়নি বাংলাদেশ ও তার জনগণ।

বাংলাদেশের বন্ধু ভারতের বরেণ্য রাজনীতিবিদ অভিজ্ঞ অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিও বলেছেন, গণতান্ত্রিক সমাজে সংলাপের বিকল্প নেই। সংলাপ এবং সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছার পরামর্শই তিনি দিয়েছেন।” একই বছরে ছাপানো ভিন্ন এক নিবন্ধে পীর লিখেছিলেন, “আজ রক্তে লেখা স্বাধীনতার এই পবিত্র মাসে গণতান্ত্রিক দুনিয়ার বৃহত্তম ভারতের রাষ্ট্রনায়ক প্রণব মুখার্জিকে সম্মান দিয়ে বাংলাদেশের জনগণকে সম্মানিত করতে খালেদা জিয়া সংসদে যান। প্রণব মুখার্জি সংসদে যখন ভাষণ দেবেন তখন সংসদ নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে আপনিও টেবিল চাপড়ে অভিনন্দিত করবেন। সব সংসদ সদস্য একতালে টেবিল চাপড়াবেন। আমরা দেশের মানুষ আনন্দচিত্তে বলব, বাহ কী সুন্দর আমাদের সংসদ। আমাদের মহান সংসদের প্রতিনিধিরা। প্লিজ খালেদা জিয়া, প্রণব ভাষণ দেবেন। আপনি সংসদে যান। বর্জনের পথে হাঁটবেন না।”

প্রণব বাবু এবং ভারতের প্রতি পীরের যে হৃদয়াকুল করা মহব্বত তা আমাকে বিস্মিত করে ভিন্ন কারণে। প্রণব মূখার্জীদের প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে আওয়ামী লীগ; গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চার পথ রুদ্ধ করে তারা দেশকে ঠেলে দিয়েছে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে; গণজাগরন মঞ্চের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে প্রণব বাবু দুদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন সেসময়; এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন নামক প্রহসনও আদতে তাদেরই কারসাজি।

এতদসত্ত্বেও পীর হাবিবদের মতো একচোখা বুদ্ধিজীবীরা ভারততোষণ নীতিকেই বেছে নিয়েছেন তাদের জীবনজীবিকার পাথেয় হিসেবে, এ নিয়েও আমার কোন হতাশা নেই। ইতিহাস বলে, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়ে যারা নিজভূমে হাসিমুখে দাসত্ব বরণ করে, সে দালালরা হয় মাটিরই অভিশপ্ত সন্তান। মীর জাফর, জগৎ শেঠ, লেন্দুপ দর্জি কিংবা হামিদ কারজাই – এরা ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা ছিলো না, যার যার মাতৃভূমিতেই তাদের জন্ম হয়েছিলো। যেমনটি লিখেছি, আমার ক্ষোভ অন্যত্র আর তা হলো পীর সাহেবের দ্বিচারিতা।

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, কলকাতায় অবস্থিত ভারতীয় জাতীয় জাদুঘরে জিয়াউর রহমানের ছবির পাশে পরিচয় লেখা আছে ‘বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি’। সেখানে আরও লেখা রয়েছে, “তিনিই (১৯৭১ সালে) জাতির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা প্রথম ঘোষণা করেন।” এখন কী বলবেন পীর হাবিবুর রহমান? তারেক রহমান না হয় ‘ঔদ্ধত্য’ দেখিয়েছেন রাষ্ট্রপিতাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও প্রথম প্রেসিডেন্ট বলে ইতিহাস রচনা করে, কিন্তু প্রণব বাবুদের হাঁটুর উপরিভাগ চাটতে চাটতে ক্লান্ত পীরদের কি মানাবে ভারতস্বীকৃত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও চ্যালেন্জ করা? সেটা কি তাদের জন্য আত্মপ্রতারণার সামিল হয়ে যাবে না? The Uses and Abuses of Hostory বইতে মার্গারেট ম্যাকমিলান এমন প্রতারকদের হাতেই ইতিহাসকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

না আলোচনা করলেও হয়তো হতো, তবে নিতান্তই প্রাসঙ্গিক বিধায় একটু বলার লোভ সামলাতে পারছি না। পীর সাহেব লিখেছেন, জিয়াউর রহমান কখনো তার জীবদ্দশায় দাবি করেন নি তিনি স্বাধীনতার ঘোষক অথবা বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। আমি পীর-আউলিয়া নই, ধ্যানজ্ঞানে তথ্য পাই না, কিন্তু যতটুকু লেখাপড়া করে শিখেছি তাতে জানি অ্যাব্রাহাম লিংকনও বেঁচে থাকতে কখনো নিজমুখে বলেননি তিনি অ্যামেরিকান ইউনিয়নের রক্ষাকর্তা কিংবা মুক্তিকামী দাসদের উদ্ধারক, জর্জ ওয়াশিংটন বা থমাস জেফারসনও নিজেদের অ্যামেরিকান কনফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে জাহির করেন নি।

মানবতার মুক্তিদূত নেলসন ম্যান্ডেলার কোন বক্তব্যেও শুনিনি তিনি নিজেকে আধুনিক দক্ষিণ আফ্রিকার জনক বলে দাবী করেছেন। কিন্তু লোকেরা সত্যিকারের ইতিহাস জানে ও মানে। পীর হাবিব আর একটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন, “বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেদিন স্বভাবসুলভ কায়দায় এক জায়গায় বলেছেন, জিয়ার সেই স্বাধীনতা ঘোষণা পাঠ আমাদের উজ্জীবিত করেছিল। কিন্তু এ নিয়ে বাড়াবাড়ির কী আছে?” অর্থাৎ “I Declare Independence of Bangladesh.” উচ্চারণ করেও পীরের বয়ানে জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণার পাঠক! এ বিষয়টি বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতি আমাকে বেশ উৎসুক করে তুলেছে।

বহু ঘটাঘাটি করেও আমি আজতক এ ধরণের কোন ঘোষণার পাঠক পাইনি যার কন্ঠে শোনা গেছে “I Declare Independence…” আমাদের চোখের সামনে সর্বশেষ স্বাধীনতার ঘোষণাটি এসেছে স্পেনের ক্যাটালনিয়া থেকে। বিবিসি, সিবিএসসহ আন্তর্জাতিক সকল মিডিয়া খবর প্রচার করেছে, ক্যাটালনিয়ার পার্লামেন্ট সে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। পাঠক ও ঘোষকের বিভাজনে এখানে মিডিয়া পালন করেছে ঘোষকের ভূমিকা। জিয়াউর রহমান যদি শেখ মুজিবের ঘোষিত স্বাধীনতার খবরই পাঠ করতেন তাহলেতো কমন সেন্সই বলে তিনি বলতেন, “শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।” পাঠক হলে শহীদ জিয়া নিশ্চয়ই বলতেন না, “আমি, মেজর জিয়া, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি।” অনেক জটিল বিষয়ের সমাধান খুব সহজ, তার জন্য বেশি জ্ঞানী হতে হয় না। মুখে মুখেই বহু বড় অংকের উত্তর বের করে ফেলা যায়, দরকার শুধু কমন সেন্স। দুর্ভাগ্যের বিষয়, পীরতত্ত্বে আক্রোশ যতটা ফুটে উঠেছে, কমন সেন্স ততোটা নয়।

পীর হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের কোটি মানুষের প্রিয় নেতা, তৃণমূল রাজনীতির প্রবক্তা, সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপকার, পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক, বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অশ্রাব্য ভাষায় আক্রমণ করে চলেছেন যার পুনরুক্তিও আমার রুচিশীলতায় বাধে। সুস্থ মানসিকতার কোন সাংবাদিকতায় এমন ভাষার জন্ম হয় না; ভাড়া খাটলে যখন মানবের বিবেক লোপ পায়, কেবল তখনই কেউ তার অশিতে এরকম ছোরা শানায় আর প্রলাপ বকে, ‘তারেক রহমান বিএনপি ও দেশের বোঝা’। তবে সুখের কথা, পীর সাহেব শুনে হয়তো আহত হবেন কিংবা নতুন ফন্দি আঁটবেন, পীরদের ঝাড়ফুঁকে জনগণ এখন আর বিশ্বাস করে না। দুনিয়া এগিয়েছে। মানুষ এখন ইতিহাসও জানে, ধান্দাবাজিও বোঝে।

তথ্য আর তত্ত্বের মাঝে পার্থক্য কী সেটাও তাদের অজানা নয়। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলে যে একটা বিষয় আছে আর Parasite Journalism যে আমাদের সুন্দর-সুস্থ জীবনকে প্রতিদিন আষ্টেপৃষ্ঠে গিলে খাচ্ছে, সে পুস্তকও আমরা পাঠ করেছি। বিএনপি ও এ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধ ষড়যন্ত্রমূলক নিবন্ধ পীর হাবিব আগেও বহু লিখেছেন। আমি উদাহরণ হিসেবে এখানে কেবল একটি উদাহরণ টানবো। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মানবজমিনে প্রকাশিত একটি লেখায় পীর সাহেব ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে বিএনপি সরে আসতে পারে। এমনকি দল ক্ষমতায় এলে তারেক রহমান দেশে ফিরবেন না এবং রাজনীতিতে প্রভাব রাখবেন না এমন আপার্তবৈপরীত শর্তেও রাজি হয়ে বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন। বিএনপিতে ভাঙন ধরাতে, নেতাকর্মীদের মনোবল ভাঙতে কত কী করে যাচ্ছে ভাড়াটিয়া লেখকরা, দেখতে দেখতে ঘেন্না ধরে গেলো। কিন্তু এসবে কল্কে মিলবে না।

তারেক রহমান ভালো কি মন্দ, দলের বোঝা নাকি আশীর্বাদ, জনতার নেতা না রাহুগ্রাস, বিএনপিতে তার প্রভাব থাকবে কি থাকবে না, সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে কেবল দলের নেতাকর্মীরা আর বাংলাদেশের আপামর জনগণ। ফয়সালার জন্য প্রয়োজন কেবল হাসিনাবিহীন একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন যা হবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে। কোন পীরের মন্ত্রে আমাদের ভাগ্য পরিবর্তন হতে দেবো না আমরা। পীর হাবিবকে অনুরোধ করবো, তারেক রহমানের পেছনে লেগে না থেকে বাংলাদেশের হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য দোয়াদরূদ পড়ুন, তাবিজকবজ দিন। একবার শুধু আমরা আমাদের ভোটের অধিকার ফিরে পাই, তখন দেখবেন, জনতা তাদের কাঁধ থেকে কোন্ কোন্ বোঝা নামিয়ে ফেলে। বাংলাদেশের খেটে খাওয়া কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতার কাছে তারেক রহমান নয় বরং আপনার মতো পরান্নভোজী পীরমুর্শিদ এবং আপনাদের প্রভুরাই সবচেয়ে ভারি বোঝা। এ বোঝা আমরা আর বহন করতে পারছি না। একটা সুন্দর নির্বাচন দিন, আমরা সব বোঝা নামিয়ে ফেলবো

পীর হাবিবুর রহমানের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে আমার কোন ধারণাই নেই, দু’দুটি বাজে লেখা পড়ার পর জানার আগ্রহও লোপ পেয়েছে। কোথায় তিনি সাংবাদিকতার ওপর লেখাপড়া করেছেন অথবা আদৌ এ বিষয়ে তার অ্যাকাডেমিক কোন জ্ঞান আছে কিনা আমি তা জানি না। তবে ভাষা ব্যবহারে তিনি যে বিকারগ্রস্ততার পরিচয় দিয়েছেন তাতে অনুমান করতে পারি, নিজের একান্ত ভূবনে পীর সাহেব মুরিদবিহীন একজন নি:স্ব মানুষ যিনি প্রচন্ড হতাশার মাঝে ডুবে আছেন। তিনি তারেক রহমানের আশপাশের নেতাকর্মীদের আখ্যায়িত করেছেন ‘প্রভুভক্ত পোষা কুকুর’ নামে; বরেণ্য শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, প্রফেসর এমাজ উদ্দিনকে বলেছেন ‘বিএনপির পোষ্য বুদ্ধিজীবি’। সুনির্দিষ্ট দুষ্ট লক্ষ্য না থাকলে এমনভাবে কেউ লিখতে পারে না। পীর হাবিব ইতিহাসকে দেখতে চেয়েছেন তার প্রভুদের চোখে। তাই তিনি ‘সিলেক্টিভলি’ ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশের অতীত, মার্গারেট ম্যাকমিলানের ভাষায় ‘অপব্যবহার’। কোন সন্দেহ নেই, ইতিহাস সম্পূর্ণ অরক্ষিত এই প্যারাসাইটদের হাতে।

পরিশেষে, পীর সমীপে নয়, কেবল পাঠকদের অবগতির জন্য জানিয়ে রাখছি, তারেক রহমান যাদের নিয়ে কাজ করেন তাদের অধিকাংশই দেশবিদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ হতে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে আসা। পেশাগত জীবনেও তারা সফল। তারা মেধাবী, রুচিশীল, উন্নতমনা ও দেশপ্রেমিক। পীরের ভাষায় ‘কুকুর’ হলেও তারা দেশেরই সন্তান, ভিনদেশী প্রভুদের কৃতদাস নয়। এদের অনেকের জীবনে এমনসব অর্জন রয়েছে যা কয়েক প্রজন্মের পীরালি দিয়েও লাভ করা যায় না।

উনিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতার পংক্তি মনে পড়ছে- “ভাতৃভাব ভাবি মনে, দেখ দেশবাসীগণে, প্রেমপূর্ণ নয়ন মেলিয়া। কতরূপ স্নেহ করি, দেশের কুকুর ধরি, বিদেশের ঠাকুর ফেলিয়া।।” বাংলাদেশের আমজনতা বিদেশী ঠাকুরদের পদলেহন করার চেয়ে দেশীয় ‘কুকুর’দের প্রতি মমতা পোষন করতেই বেশি ভালোবাসে। পীর হাবিবরা ব্যতিক্রম।

লেখক: আইনজীবি ও রাজনীতিবিদ
বিএনপি সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা

]]>
আবহমান গ্রামবাংলার বৈচিত্র্যপূর্ণ উৎসবে গ্রামীণ জনতার প্রাণোচ্ছলতায় খেজুর রসের উপাখ্যান http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a6%86%e0%a6%ac%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%97%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%ac%e0%a7%88%e0%a6%9a%e0%a6%bf%e0%a6%a4/ Wed, 08 Nov 2017 15:58:02 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=83246

নজরুল ইসলাম তোফা : হেমন্তের শেষে শীতের ঠান্ডা পরশে মাঝেই বাঙালির কাছে খেজুর গাছের রসে নিজেকে ডুবিয়ে নেওয়ার সুন্দর এক মাধ্যম আবহমান বাংলার চাষী। একঘেয়েমি যান্ত্রিকতার জীবনে অনেক পরিবর্তন এনে থাকে শীত ঋতুচক্র। বৈচিত্র্যপূর্ণ গ্রামীণ সংস্কৃতির এই শৈল্পীক ঐতিহ্যের চরম প্রাণোচ্ছলতায় আসলেই ঋতুচক্র বছর ঘুরেই দেখা দেয় বারবার। এই শীত কাল গ্রামীণ মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গ্রামীণ জীবনে শীত আসে বিশেষ করে চাষীদের কাছে সে তো বিভিন্ন মাত্রায় রূপ নিয়ে। স্বপ্ন আর প্রত্যাশায় তাদের অনেক খানি খেজুর গাছের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গি বসবাস হয়ে যায়। নানা ভাবে জড়িত চাষীর জীবন সংগ্রামে বহু কষ্টের মাঝে অনেক প্রাপ্তিই যুক্ত হয় বাংলার এই জনপ্রিয় তরুবৃক্ষ খেজুর গাছের সঙ্গে। ভূমিহীন চাষী, প্রান্তিক চাষী বা দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষের জন্য এই সময়টা হয় অনেক আনন্দদায়ক।

কারণ, গাছই তো চাষীর অন্নদাতা। তাদের খেজুর গাছের যত্ন-আত্তি না করলে যে রস মিলবে না। আর রস না মিললে গুড় হবে কি করে। পাটালি না দেখলে যেন ঘুম আসে না চাষীর। চাষী তাদের মেয়ে বা বউয়ের হাতের কাঁচা সুপারির কচি পান গালে ভরে বাঁশের ডালি মাথায় করে গঞ্জে বা দূর্বতী হাটে যাবেই বা কি করে। পাটালি গুড়ের মিষ্টিমধুর গন্ধে চাষীরা বিক্রয় কাজে না থাকলে পেটে ভাতে বাঁচবে কি করে। শীত আমেজে প্রকৃতির মাঝ হতে সংগীহিত খেজুর রস চাষীরা যেন চষে বেড়ায় সকাল, বিকেল ও সন্ধ্যায় মেঠো পথ ধরে, তারই বহিঃপ্রকাশে যেন চমৎকার নান্দনিকতা এবং অপরূপ দৃশ্য অনুভব করে, তা যেন অবশ্যই এক শৈল্পীকতার নিদর্শন।

এমন শৈল্পীক আস্থা ও বিশ্বাসকে নিয়ে প্রকৃতির মাঝে বিশাল আকৃতির এক কুয়াশা চাদরে মুড়ি দিতে হয়। এই শীতেকালে রূপ সৌন্দর্যের আর একটি উপাদেয় সামগ্রী খাঁটি শরিয়া তেল, যা শরীরে মালিশ করে অনেকাংশেই ত্বকের মশ্রিণতা এবং ঠান্ডা দূর করে খেজুর গাছে উঠতে। গ্রামে খুব ভোরে খেজুর গাছ হতে রসের হাড়ি নামিয়ে আনতে ব্যস্ত হন চাষী। রাতের এ হিমশীতল রস ভোরে হাড় কাঁপানি ঠান্ডায় গাছ থেকে নামিয়ে খাওয়ার যে স্বাদ তা একেবারেই যেন খুব আলাদা। আসলে ভোর বেলায় রস খেলে শীত আরো অনেক জাঁকিয়ে বসে। আবার শীতে শরীর কাঁপানির এক স্পন্দন যেন চরম মজা দায়ক। শীত লাগে লাগুক না কেন, তবুও রস খাওয়ার কোন বিরাম নেই। এক গ্লাস, দুই গ্লাস খাওয়ার পরপরই কাঁপতে কাঁপতে যেন আরও এক গ্লাস মুড়ি মিশিয়ে মুখে তুলে চুমক দেয়া আর রোদ পোহানো সে যে কি আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা দূরহ।

এই শীতের কুয়াশা ঢাকা সকালে গ্রামের ছেলে মেয়েরা ঘুম থেকে খুব ভোরে উঠে হাত মুখ ধুয়ে খড় কুটোয় আগুন জ্বেলে হাত পা গরম করে এবং অপেক্ষা করে কখন রোদের তেজ প্রখর হবে। তাদের রোদ পোহানোর আরামের সঙ্গে আরও অপেক্ষা, তা হলো তাদের প্রিয় খেঁজুর রস। কখন যে আসে আর তখনই খাবে। সে রস আসলে যথা সময়ে হাজির হলে তাদের কাছে যেন আনন্দ উল্লাসের কোনই কমতি হয়না। গ্রামবাংলার অভাবী মেয়েরা রংবে রংয়ের যেসব খেজুর পাতায় খেজুর পাটি তৈরী করে তার উপরই যেন চলে রস খাওয়ার আসর। উপার্যনের জন্যই খেজুর পাতা শুকিয়ে তা দিয়ে খেজুর পাটি তৈরী পর বিক্রয় করে সংসারের কিছুটা অর্থ সংকোলান হয়। সুতরাং এই খেজুরের পাটিতেই গ্রামের অনেক পরিবার ঘুমানো কাজে তা ব্যবহার করে। খেজুর পাতায় এক ধরনের সাহেবী টুপিও তৈরি হয়। খেজুরের পাতা, ডাল এবং গাছ শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়ে থাকে। আর মোরুব্বা তৈরিতেও খেজুর কাটার ব্যবহার প্রচলিত আছে। এক কথায় বলা চলে খেজুর গাছের পাতার ও ডাল সেতো কবর পর্যন্ত চলে যায়।

খেজুর গাছ ছয় সাত বছর বয়স থেকে রস দেওয়া শুরু করে। পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছর পর্যন্ত রস দেয়। গাছ পুরনো হয়ে গেলে রস কমে যায়। আর পুরনো খেজুর গাছের রস খুব মিষ্টি হয়। মাঝ বয়সী গাছ থেকে সবচেয়ে বেশি রস পাওয়া যায়। বেশি রস সংগ্রহ করা গাছের জন্য অবার অনেক ক্ষতিকর। রস সংগ্রহের জন্য কার্তিক মাসে খেজুর গাছ কাটা শুরু হয়। কার্তিক মাস থেকেই রস পাওয়া যায়। রসের ধারা চলতে থাকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। শীতের সঙ্গে রস ঝরার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। শীত যত বেশি পড়বে তত বেশি রস ঝরবে। রসের স্বাদও তত মিষ্টি হবে। অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ মাস হলো রসের ভর মৌসুম। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত একটি খেজুর গাছে মাসে ৪০ কেজি রস পাওয়া যেতে পাবে। খেজুর গাছ শুধু রস দিয়েই ক্ষান্ত হয় না। শুকনো খেজুরে ভেষজ গুন অনেক রয়েছে, খেজুরের বীজগুলো বাহির করে নিয়ে দুধে খেজুর গুলো মিশিয়ে ভাল ভাবে ফুটিয়ে গরম করে এই দুধ, খেজুর ঠান্ডা করে শিশুকে খাওয়ালে শক্তি বাড়ে৷ আবার একটি শুকনো খেজুরের ফলের পুষ্টি মান তুলে ধরে বলা যায়, প্রায় ৭৫-৮০% শর্করা, ২% আমিষ এবং প্রায় ২.৫% স্নেহজাতীয় পদার্থ থাকে। ১০০ গ্রাম শাঁসে ২০ ভাগ পানি, ৬০-৬৫ ভাগ শর্করা, ২ ভাগ আমিষ এবং খুব সামান্য কপার, সালফার, ম্যাগনেসিয়াম, ভিটামিন এ, বি-১, বি-২ এবং খনিজ লবণ খোঁজে পাওয়া যায়।

চাষীরা দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান এ গাছে থেকে সে গাছে। মাটিতে পা ফেলার ফুরসতটুকুও পায় না অভাবী এই মানুষ গুলো। শীত আসা মাত্রই খেজুর গাছ ‘তোলার জন্য’ অনেক আগে থেকেই সকাল-সন্ধ্যায় যেন লেগে থাকে চাষী। খেজুর গাছ বিশেষ কায়দায় কাটতে হয়। আর এই গাছ গুলো কাটে যারা তাদেরকে ‘গাছি’ বলা হয়। তারা বিভিন্ন উপকরণ সমন্বয়ে গাছি নাম ধারি মানুষ পরিচ্ছন্ন ভাবে গাছ কাটার জন্য ব্যস্ত হয়ে যান। তারা গাছ কাটতে ব্যবহার করেন দা, দড়ি, এক টুকরো চামড়া বা পুরনো বস্তা আবার দা রাখার জন্য বাঁশ দিয়ে তৈরি থলি বা ঝাঁপি। সে ঝাঁপি গাছিরা রশি দিয়ে খুব যত্নে দা রেখে এ গাছ থেকে সে গাছে উঠা, নামা করে সুবিধা পায়। আবার কোমরে বেশ কিছু চামড়া বা বস্তা বেঁধে নেয় যেন গাছে উঠা নামায় কোন প্রকার সমস্যা না। গাছ কাটার জন্য গাছি শরীরের ভারসাম্য রক্ষার সময় কোমর বরাবর গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে নেয়। দড়িটা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। এই দড়ির দুই মাথায় বিশেষ কায়দায় গিট দেওয়া থাকে। গাছে উঠার সময় গাছি অতি সহজে মুহূর্তের মধ্যে গিঁট দুটি জুড়ে দিয়ে নিজের জন্য গাছে উঠার নিরাপদ ব্যবস্থা করে নেয়।

রস জ্বাল দিতে যে পরিমাণ জ্বালানির প্রয়োজন তা পাওয়া যায় না এমন আক্ষেপে চাষীর বউ ঝগড়া করলেও চালের আটায় তৈরি ভাপা পিঠা খেজুরের গাঢ় রসে ভিজিয়ে খাওয়ার পর যেন সব রাগ মাটি হয়ে যায়। আবার কখনও সখনও চাষীর বউকে এক প্রকার সান্তনা দিয়ে বলে অভাবের সংসারে যা আছে তা দিয়ে এ পেশা চালালে বাঁচা যাবে কি করে। বছরে পাঁচ মাস ধরেই তো খেজুর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করা হয় আর তা খড়কুটার জ্বালানিতে গুড় বানিয়ে বাজারে বিক্রি হয় বলেই কোন মতে পেট চলছে। বউ আবার মুচকি হাসি দিয়েই বলে, সংসার চলছে তো ভালোই কিন্তু মেয়ের বিয়ের জন্য ভাবো কিছু। তার তো বিয়ের বয়স হয়েছে, এমন কথাও চলে আসে খেজুর গাছির ছোট্ট পরিবারে। চাষীর খেয়াল তো আছে বৈকি তবে আরও পরিশ্রম ও কষ্ট করার প্রয়োজন হবে, সামনের শীতে চাষীর ইচ্ছা আরোও বেশ কিছু খেজুর গাছ বর্গা নিলেই মেয়ের বিয়ের কিছু টাকা হাতে আসবে। এমন কথা সচরাচর শুনা যায় খেজুর চাষির কন্ঠে। চাষির আদরের বিবাহিত মেয়ে জামাইকে দাওয়াত দিয়ে খেজুর রসের পিঠা পায়েসের তৈরী আয়োজনে চরম ধুম পড়ে। চাষীর মেয়ে, বউ ঝিয়েরা খেজুরের রস বা গুড় তৈরিতে অত্যন্ত ব্যস্ত সকালের মনোরম পরিবেশে উপভোগ করে। এমন এক চমৎকার দৃশ্য বড়ই শৈল্পিক উপাখ্যান। শুধুই কি তাই, শীতের এই সকালে রস বা পাটালি গুড় তৈরীতে জ্বালানীর পাশে বসে অথবা লেপমুড়ি দিয়ে চিড়া, মুড়ির মোয়া খাওয়ার মজার পরিবেশ চাষীর পরিবারের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সহ আদরের মেয়ে জামাই ভুল করে না। তাদের শীতের উপাদেয় খাবার খেজুরের রস সংগ্রহে ব্যস্ত চাষীরা এ গাছ থেকে ও গাছে খেজুর রস সংগ্রহে শীত কাঁপানি কন্ঠে গান ধরে।

রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে গুড়। সেই গুড়ের আবার রকমফের আছে। যেমন, পাটালি গুড়, ঝোলা গুড়। এ সব গুড় বিভিন্ন ভাবে খাওয়া হয়। শীতের খেজুর গাছের রস হতে যে গুড়ে তৈরি তা দিয়ে দুধের পিঠা, পুলিপিঠা, সেম পিঠা আরো কত কিযে পিঠা তৈরী হয় তা না খেলে একেবারে জীবনই বৃথা। পাটালি গুড় দিয়ে মুড়ির মোয়া খাওয়া ও ঝোলা গুড়ের সহিত মচমচে মুড়ি খাওয়ার জনপ্রিয়তা গ্রামীণ শুধুই মানুষের রয়েছে। এমনিতেই তারা খেজুর গুড় গ্রামের অনেকেই খায়। তবে খেজুরের রস দিয়ে তৈরি রসের পিঠা খুবই সুস্বাদু হয়ে থাকে। আর খেজুর গুড়ের প্রচলিত সন্দেশ হয় তার স্বাদ অপূর্ব। শখ করে অনেক চাষিরা চা খাওয়ার নেশায় ঘরেই চা বানিয়ে খায় খেজুর গুড়কে উপজীব্য করে।

শীত তার বিচিত্র রূপ ও রস নিয়ে হাজির হয় গ্রাম বাংলায়। নবান্ন উৎসব কিংবা শীতের পিঠা পায়েশ তৈরির উৎসব শীতে ঘটা করেই হয়। শীতে চিরায়ত যা কিছু সৃষ্টির নিয়ামত, তা উপলব্ধি করতে চাইলে অবশ্যই গ্রামে যেতে হবে। শীতের নিরবতার অস্তিত্ব সৌন্দর্য মন্ডিত বাংলাদেশের ষড় ঋতুর এক ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিয়মান হয় খেজুর গাছ। আশ্বিনের শুরু থেকেই চাষীরা খেজুর গাছ তোলা এবং পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই উপযুক্ত সময় তারা নির্ধারণ করে মাঘের ‘বাঘা শীতে’ গুড় বিক্রিয় এবং তৈরীর প্রক্রিয়া যেন শেষ হয়। তাদের প্রক্রিয়াজাত খেজুর গুড়, পাটালি বা রস সারা বছর সংগ্রহ করে রাখে কোন কোন গ্রামের গৃহস্থ পরিবার। গ্রামের বাজার গুলোতেও জমজমাট হয়ে ওঠে খেজুর রস এবং গুড়ে। প্রকৃত পক্ষেই শীতে উৎসব মুখর হয়ে উঠে গ্রামবাংলা। জলাভূমি এবং কিছু পাহাড়ি ভূমি বাদে এদেশে এমন কোনো অঞ্চল নেই, যেখানে খেজুর গাছ জন্মে না। তবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমা অঞ্চলে খেজুর গুড় বাণিজ্যিকভাবেই উৎপাদিত হয়।

গাছ কাটার জন্য গাছের মাথার এক দিকের শাখা কেটে চেঁছে পরিষ্কার করে সেই কাটা অংশেরই নিচ বরাবর দুটি খাঁজ কাটার প্রয়োজন পড়ে। সে খাঁজ থেকে কয়েক ইঞ্চি নিচে একটি সরু পথ বের করা হয়। এই সরু পথের নিচে বাঁশের তৈরি নলী বসানো হয়। এই নলী বেয়ে হাড়িতে রস পড়ে। নলীর পাশে বাঁশের তৈরি খিল বসানো হয়। সে খিলেই মাটির হাড়ি টাঙিয়ে রাখা হয়। বিকেল থেকে হাড়িতে রস জমা হতে হতেই সারা রাত্রিতে হাড়ে পূর্ণ হয়। গাছ কাটার পর দুই তিন দিন রস পাওয়া যায়। প্রথম দিনের রসকে বলে জিরান কাট। জিরান কাট রস খুবই সুস্বাদু। প্রথম দিনের রস থেকে ভালো পাটালি গুড় তৈরি হয়। দ্বিতীয় দিনের রসকে বলে দোকাট। তৃতীয় দিনের রসকে বলে তেকাট। রসের জন্য খেজুর গাছে একবার কাটার পর আবারও পাঁচ ছয় দিন পর কাটতে হয়। গাছের কাটা অংশ শুকানোর জন্য এসময় দেওয়া প্রয়োজন পড়ে। খেজুর গাছ কাটা অংশ শুকানোর সুবিধার জন্যই সাধারণত পূর্ব ও পশ্চিম দিকে গাছ কাটা হয়। যাতে সূর্যের আলো সরাসরি কাটা অংশে পড়ে।

গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য মাটির হাড়ি ব্যবহার করা হয়। হাড়িকে আবার অনেকে বলে ভাঁড়। ঠিলা হিসেবেও হাড়ির নাম ব্যবহার হয়। যে যাই বলুক না কেন, ভাঁড়টি আসলেই খুব ছোট আকৃতির কলসের মতো হয়ে থাকে। মাঝারি আকৃতির দশ বা পনেরো ভাঁড় রস জ্বাল দিয়েই এক ভাঁড় গুড় হয়। সেই এক ভাঁড় গুড়ের ওজন ছয় থেকে আট কেজির মতো বলা চলে। গুড় তৈরির জন্য রস জ্বাল দেওয়া হয় মাটির জালায় বা টিনের তাপালে। খুব সকালে রস নামিয়ে এনেই জ্বালানো হয়। জ্বাল দিতে দিতে এক সময় রস ঘন হয়ে গুড় হয়ে যায়। এ গুড়ের কিছু অংশ তাপালের এক পাশে নিয়ে বিশেষ ভাবে তৈরি একটি খেজুর ডাল দিয়ে ঘষতে হয়। ঘষতে ঘষতে এই অংশটুকু শক্ত হয়ে যায়। আর শক্ত অংশকেই আবার কেউ কেউ বীজ বলে থাকে। বীজের সঙ্গে তাপালের বাকি গুড় মিশিয়ে স্বল্পক্ষণের মধ্যে গুড় জমাট বাঁধতে শুরু করে। তখন এ গুড় মাটির হাঁড়ি বা বিভিন্ন আকৃতির পাত্রে রাখার প্রয়োজন পড়ে। সে গুড় দেখলে বুঝা যাবে, একেবারে জমাট বেঁধে পাত্রের আকৃতি ধারণ করেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বহুকাল ধরে পেশাদার খেজুর গাছ কাটিয়ে আছে। স্থানীয় ভাষায় এদের বলা হয় গাছি। কার্তিক মাসের শুরু হতে চৈত্রের শেষ পর্যন্ত তারা খেজুর গাছ কাটায় নিয়োজিত থাকে। যেসব চাষির স্বল্প সংখ্যক খেজুর গাছ আছে নিজেরাই তারা তা কাটে থাকে। তারাই রস পাড়ে ও বাড়িতে নিয়ে এসে জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করে। শীতের এ প্রকোপ যত বেশি হয়, রসও তত বেশি পান চাষী। রস গাছে যখন কমে যায় তখন সে রসের স্বাদ যেন বেশী হয়। এ রসকে ‘জিরান কাট’ রস বলে, গন্ধেও এ রস হয় সবচেয়ে উত্তম। এই ‘জিরান কাট’ রস নামানোর পর আবারও রসের ভাঁড় বা কলস গাছে টাঙালে তখন এই খেজুর গাছ হতে যে রস পাওয়া যাবে তা ‘উলাকাটা’ রস। গ্রাম বাংলায় এই শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে যারা খেজুর বনের চাষ করে তারাই তো গভীব রাতে খেজুর রস নামিয়ে উনুনের আগুনে জ্বালাতে ব্যস্ত হয়। সত্যিই এমন দৃশ্য দেখা যায় খেজুর বনের পাশে উঁচু ভিটায়। এমন নিবিড় স্তব্ধতার মধ্যেও যেন জীবন সংগ্রামে তাদের মজার স্পন্দন উপলব্ধি হয়। উনুনের পাশেই থাকে গাছি বা শ্রমিক মজুর, তাদের থাকবার জন্য বানায় কুঁড়ে ঘর, খেজুরের পাতা কিংবা বিচালি দিয়ে ছাওয়া হয়। কান পাতলে শোনা যায়, গাছিয়া নিঃসঙ্গতা কাটাতে গ্রাম এলাকায় প্রচলিত বিভিন্ন ধরনের গান গেয়ে থাকে। তাদের সুরে আছে অদ্ভুত প্রাণময়তা ও আবেগ, সহজেই হূদয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার মতো।

পত্রবৃন্তে আবৃত খেজুরের কাণ্ডটি সরল, গোলাকৃতি এবং ধূসর বর্ণের হয়। মাথায় মুকুটের মতো ছড়ানো পাতা গুলো উর্ধ্বমুখী ও ছুরির ফলার মতো তীক্ষ্ণ। খেজুরের ‘ভিন্নবাসী’ গাছে স্ত্রী ফুল ও পুরুষ ফুল আলাদা ভাবেই গাছে জন্মায়। খেজুর গাছের পুং পুষ্পমঞ্জরী খাটো, ফুল সাদা মোচার মত বা ঘিয়ে রঙের মতো দেখতে হয়। খেজুর গাছের পরিপক্ক এ ফুলের মোচায় ঝাকুনি দিলেই ধুলার মতো পুংরেণু বাহির হতে দেখা যায়। আবার স্ত্রী পুষ্প মঞ্জরী লম্বা এবং ফুলের রং হালকা সবুজ হয়ে থাকে। স্ত্রী গাছে অজস্র ফল হয়ে থাকে তা অনেক উজ্জ্বল দেখায়। একটা মজ্ঞরীতে অনেক স্ত্রী ফুল ফোটে, যা থেকে একটি কাঁদি তৈরী হয়। খেজুর গাছের মাথায় খুব সূচালো অসংখ্য কাঁটার সমন্বয়ে ঝোপের মতো হয়ে সৃষ্টি এ গাছ। খেজুর গাছের পাতার গোড়ার দিকের প্রতিটি পাতা কাঁটায় রূপান্তরিত হয়। সাধারনত এই পাতা ৩ মিটার লম্বা এবং নীচের দিকে বিশেষ করে বাঁকানো হয়। খেজুর গাছ সারা বছর একই রকমেই থাকে। পাকা ফল দেখতে পার্পেল-লাল রঙের এবং তা সুমিষ্ট হয়, খাওয়াও যায়। পাখিদেরও প্রিয় এটি।

শীত কালে খেজুরের রস সবারই রসনা তৃপ্ত করে। আর খেজুর গাছের মাথার কচি অংশ তো দারুন লাগে খেতে। খেজুর গাছ ছয় সাত বছর বয়স থেকে রস দেওয়া শুরু করে। পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছর পর্যন্ত রস দেয়। গাছ পুরনো হয়ে গেলে রস কমে যায়। পুরনো গাছের রস খুব মিষ্টি হয়। মাঝ বয়সী গাছ থেকে সবচেয়ে বেশি রস পাওয়া যায়। বেশি রস সংগ্রহ করা গাছের জন্য ক্ষতিকর। রস সংগ্রহের জন্য কার্তিক মাসে খেজুর গাছ কাটা শুরু হয়। কার্তিক মাস থেকেই রস পাওয়া যায়। রসের ধারা চলতে থাকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। শীতের সঙ্গে রস ঝরার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। শীত যত বেশি পড়বে তত বেশি রস ঝরবে। রসের স্বাদও তত মিষ্টি হবে। অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ মাস হলো রসের ভর মৌসুম। একবার গাছ কাটার পর দুই তিন দিন রস পাওয়া যায়। প্রথম দিনের রসকে বলে জিরান কাট। জিরান কাট রস খুবই সুস্বাদু।

প্রথম দিনের রস থেকে ভালো পাটালি গুড় তৈরি হয়। দ্বিতীয় দিনের রসকে বলে দোকাট। তৃতীয় দিনের রসকে বলে তেকাট। রসের জন্য গাছ একবার কাটার পর পাঁচ ছয় দিন পর আবার কাটা হয়। গাছের কাটা অংশ শুকানোর জন্য এসময় দেওয়া হয়। কাটা অংশ শুকানোর সুবিধার জন্যই সাধারণত পূর্ব ও পশ্চিম দিকে গাছ কাটা হয়। যাতে সূর্যের আলো সরাসরি কাটা অংশটুকুতে পড়ে। রস পেতে হলে খেজুর গাছ বিশেষ কায়দায় কাটতে হয়। যারা গাছ কাটে তাদের বলা হয় গাছি। গাছিদের গাছ কাটার জন্য কয়েকটি উপকরণ দরকার হয়। যেমন-দা, দা রাখার জন্য একটি ঝাঁপি, দড়ি এবং এক টুকরো চামড়া বা পুরনো বস্তা। গাছি যে ঝাঁপি ব্যবহার করে তা বাঁশ দিয়ে তৈরি। গাছে উঠার সময় গাছি এই ঝাঁপিতে দা রাখে। কোমরে বেঁধে নেয় চামড়া বা বস্তা। গাছ কাটার সময় শরীরের ভারসাম্য রক্ষার জন্য গাছি কোমর বরাবর গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে নেয়। দড়িটা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। এই দড়ির দুই মাথায় বিশেষ কায়দায় গিট দেওয়া থাকে।

গাছে উঠার সময় গাছি অতি সহজে মুহূর্তের মধ্যে গিঁট দুটি জুড়ে দিয়ে নিজের জন্য গাছে উঠার নিরাপদ ব্যবস্থা করে নেয়।গাছ কাটার জন্য গাছের মাথার এক দিকের শাখা কেটে চেঁছে পরিষ্কার করা হয়। কাটা অংশের নিচের দিকে দুটি খাঁজ কাটা হয়। খাঁজ থেকে কয়েক ইঞ্চি নিচে একটি সরু পথ বের করা হয়। এই সরু পথের নিচে বাঁশের তৈরি নলী বসানো হয়। এই নলী বেয়ে হাড়িতে রস পড়ে। নলীর পাশে বাঁশের তৈরি খিল বসানো হয়। এই খিলে মাটির হাড়ি টাঙিয়ে রাখা হয়। এই হাড়িতে রস জমা হয়।গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য মাটির হাড়ি ব্যবহার করা হয়। এই হাড়িকে বলে ভাঁড়। কোথাও বলে ঠিলা। ভাঁড় দেখতে ছোট আকৃতির কলসের মতো। খেজুর রস মাঝারি আকৃতির দশ থেকে পনেরো ভাঁড় রস জ্বাল দিলে এক ভাঁড় গুড় হয়। এই এক ভাঁড় গুড়ের ওজন হয় ছয় থেকে আট কেজির মতো।খেজুরের রস হতে তৈরি গুড়। মিষ্টি জাতীয় খাবার। বাংলাদেশে বেশ প্রসিদ্ধ। শীতকালে তৈরি হয় এবং সারা বছরই পাওয়া যায়। প্রচুর খনিজ ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। গুড় তৈরির জন্য রস জ্বাল দেওয়া হয় মাটির জালায় বা টিনের তাপালে। খুব সকালে রস নামিয়ে এনেই জ্বালানো হয়। জ্বাল দিতে দিতে এক সময় রস ঘন হয়ে গুড় হয়ে যায়। এ গুড়ের কিছু অংশ তাপালের এক পাশে নিয়ে বিশেষভাবে তৈরি একটি খেজুর ডাল দিয়ে ঘষতে হয়। ঘষতে ঘষতে এই অংশটুকু শক্ত হয়ে যায়। এই শক্ত অংশকে বীজ বলে। বীজের সঙ্গে তাপালের বাকি গুড় মিশিয়ে দেওয়া হয়।

স্বল্পক্ষণের মধ্যে গুড় জমাট বাঁধতে শুরু করে। তখন এই গুড় মাটির হাঁড়ি বা বিভিন্ন আকৃতির পাত্রে রাখা হয়। গুড় জমাট বেঁধে পাত্রের আকৃতি ধারণ করে। এই খেজুর গুড় যারা বানায়, তাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় তারা গুড়-শিল্পী বা শিউলি। এই শিউলিরা আদতে খেতমজুর। বর্ষার দিনে অনেক অঞ্চলে চাষাবাদের পর ভূমিহীন খেত মজুরদের কোনও কাজ থাকে না। অনাহার-অর্ধাহারে তাদের দিন কাটাতে হয়। সেই সময় শিউলিরা দাদন নেয় মহাজনের কাছ থেকে খেজুর গাছ। বিনিময়ে তারা মহাজনের নির্ধারিত দামে তাদের কাছেই অনেক সময় গুড় বিক্রি করতে বাধ্য হয়। খেজুর গুড় সারা বাংলাদেশেই পাওয়া যায়। খেজুর গাছ আরবের মেসোপটেমিয়াই আদি জন্মস্থান হিসেবে বিবেচিত।এদেশে যেসব খেজুর চাষ হয় তার নাম Phoenix sylvestris। এই খেজুর গাছের উচ্চতা ১০ থেকে ১৫ মিটার হয়ে থাকে। গ্রামবাংলার এই জাতটিকে বুনো জাত হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়।

]]>
৭ নভেম্বর ও জিয়া http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a7%ad-%e0%a6%a8%e0%a6%ad%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%ac%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be/ Tue, 07 Nov 2017 00:12:47 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=83131 . এস এম সরোয়ার রহমান, অ্যাডভোকেট

১৯৭৫ সালের নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সামরিক ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় দিন। সিপাহীজনতার মধ্যে গড়ে ওঠা ফল্গুধারা হিসেবে নভেম্বর সর্বসাধারণের কাছে বিশেষভাবে বিবেচিত হয়। সেনাবাহিনীতে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিরোধ তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলছিল, তারই উদগিরণ ঘটে নভেম্বর এবং একই সঙ্গে জনমনে সেনাবাহিনীতে সবকিছু স্বচ্ছ হয়ে ওঠে। তাই নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব সংহতি দিবস। দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব দেশরক্ষা দিবস। আজ থেকে ৩৭ বছর আগে ১৯৭৫ সালের নভেম্বর এক ঐতিহাসিক অভূতপূর্ব বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল।

আধিপত্যবাদী শক্তির এদেশীয় এজেন্ট ক্রীড়নকদের সব ষড়যন্ত্রচক্রান্ত নস্যাৎ করে দিয়ে রক্তে কেনা স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল সিপাহীজনতা। রাজপথে সিপাহীজনতার মিলিত প্রতিরোধে এদিন রক্ষিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব প্রিয় মাতৃভূমি। সমুন্নত হয়েছিল সবুজের মাঝে লাল সূর্যখচিত জাতীয় পতাকা। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর জাতীয় ঐক্য স্বাধীনচেতা মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধে জাতিকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর স্পষ্ট প্রেরণা জুগিয়েছিল। জন্য নভেম্বর জাতীয় ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার দিন হিসেবে। জাতীয় ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে জনগণের আশাআকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক হিসেবে জিয়াউর রহমানের ওপর সংকট থেকে উত্তরণ জাতীয় উন্নয়নের নেতৃত্ব অর্পিত হয়।

নভেম্বর সিপাহীজনতার বিপ্লব ছিল জাতির জন্য অনিবার্য। এটি ছিল সময়ের প্রয়োজনে ঘটনার ধারাবাহিকতায় একটি স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব। কারণ স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫এর ১৪ আগস্ট পর্যন্ত দেশের মানুষের মণিকোঠায় নানা জিজ্ঞাসা ঘুরেফিরে উদয় হয়েছিল। খুনডাকাতি লুণ্ঠনে বাংলাদেশকে মগের মুল্লুকে পরিণত করেছিল তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী। রক্ষীবাহিনী লালবাহিনীর ঘোড়া দাবড়ানোর কাহিনী, সিরাজ সিকদারসহ দেশপ্রেমিক হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা, মহাদুর্ভিক্ষ, অসংখ্য বেওয়ারিশ লাশ, জঠরের জ্বালায় নিজের বমি খাওয়ার কাহিনী, বাসন্তী নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করার কাপড় না পেয়ে জাল পরে লজ্জা নিবারণ করার ঘটনায় দেশের সর্বস্তরের মানুষ ছিল উদ্বিগ্ন, দিশেহারা। কবির কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিলÑ ভাত দে হারামজাদা…, উচ্চারিত হয়েছিলধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা/রক্ত দিয়ে পেলাম শালার এমন স্বাধীনতা।

সেই দুঃসহ দিনগুলোর ইতিহাস মূলত এক অরাজকতার ইতিহাস, লুটখুন আর গুমের ইতিহাস। শোষণবঞ্চনা আর নির্যাতনের ইতিহাস। মোট কথা স্বাধীনতাপরবর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেউলিয়াপনায় সমাজে চলছিল অস্থিরতা, তৈরি হয়েছিল অমোচনীয় বৈষম্য। সমাজ মনের গভীরে চলছিল সামন্ত সমাজের নকল নবাবীর পালা, যার পরিণতি আমরা দেখি একদলীয় শাসন আর এক ব্যক্তির আজীবন রাষ্ট্রপতিত্বের লোভাচার, চলছিল বাকশাল নামীয় একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির সীমাহীন দুর্নীতি দুঃশাসন। এই দুর্নীতি দুঃশাসন থেকে বেরিয়ে আসার আকাক্সক্ষায় মানুষ যখন হাহুতাশ করছিল, মসজিদমন্দিরে মোল্লাপুরোহিতরা দণন হাত তুলে যখন প্রার্থনা করছিলÑ হে খোদা, হে ভগবান, কবে এই একদলীয় নবাবী শাসনের যবনিকাপাত ঘটবে। ঠিক সেই মুহূর্তে সপরিবারে নিহত হন স্বাধীনতাপূর্ব এই জনপদে গণতন্ত্র তথা স্বাধিকার আন্দোলনের লড়াকু সেনানী শেখ মুজিবুর রহমান।

 

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আধিপত্যবাদী শক্তির এদেশীয় এজেন্টরা স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব নস্যাতের অপচেষ্টাসহ নানান চক্রান্ত গড়ে তোলে। নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় এক অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানের সমর্থনে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের মা ভাইসহ তার সমর্থকরা রাজপথে নেমে এলে এই অভ্যুত্থান ভারতমুখী হিসেবে সব মহলে পরিচিত হয়। দেশের মধ্যে ভারতীয় এজেন্ট চররা নাশকতামূলক অপতৎপরতা চালাতে থাকে। সময় বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতের ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ ঘটানো হয়।

মুক্তিযুদ্ধের মহান ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াকে বন্দি করা হয়। সর্বত্র সন্ত্রাসআতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়া হয়। অফিসারবিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়ে সেনা অফিসারদের হত্যার নীলনকশা করা হয়। সেনা শৃঙ্খলা এবং আইনশৃঙ্খলা সার্বিকভাবে ভেঙে পড়ে। নভেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কোনো সরকার ছিল না। দেশের মানুষ নির্বাক অবস্থায় দিন গুজরান করে। সবার মনে সমূহবিপদের আশঙ্কা দানা বাঁধে। জাতীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রতিবেশী দেশের হাতে তুলে দিয়ে আমাদের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে পঙ্গু করে দেয়া ছিল সেই ষড়যন্ত্রকারীদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী আর প্রতিবাদমুখর জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধে চক্রান্তকারীদের সব নীলনকশা ভেস্তে যায়। নভেম্বর সোবহে সাদিকে মুয়াজ্জিনের আজানের সঙ্গে সঙ্গে দেশপ্রেমিক জনসাধারণ সশস্ত্র বাহিনীবাংলাদেশ জিন্দাবাদস্লোগান দিয়ে রাজপথে বেরিয়ে আসে। সিপাহীজনতার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথের অপূর্ব মিলন জাতি এই প্রথম গভীর আগ্রহে প্রত্যক্ষ করল। জিয়াকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে ক্ষমতা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু জিয়া প্রথমে এতে অপারগতা জানান, পরে সবার অনুরোধে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সেদিন সকালে জিয়া সিপাহীজনতার উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান। সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরে আসে। তাই নভেম্বর সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা বিজয়ের দিন। এই দিন জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে নিয়ন্ত্রিত না হলে সেদিন সেনাবাহিনীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির জন্য রক্তগঙ্গা বয়ে যেতে পারত। সেই মাহেন্দ্রক্ষণে জিয়া নিজের হাতে দায়িত্ব তুলে নিয়ে মারাত্মক যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিলেন এই দেশ জাতিকে।

জাতীয় বিপ্লব সংহতি দিবস হিসেবে নভেম্বরকে চিহ্নিত করার কারণ, সব জাতি এই দিন জাতীয় বিপর্যয়ের হাত থেকে জাতীয় স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। সমগ্র জাতি জিয়াউর রহমানের পাশে এসে না দাঁড়ালে এই বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়ত। নভেম্বরের সিপাহীজনতার বিপ্লব ছিল আধিপত্যবাদ সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি সময়োচিত সফল প্রয়াস। কারণ উপলক্ষে জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে নভেম্বর৭৫এর অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক শাফায়াত জামিল সাপ্তাহিক হলিডে পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, … ‘প্রকৃত প্রস্তাবে জিয়া জাতিকে সার্বিক নৈরাজ্য থেকে রক্ষা করেছেন। নভেম্বর রক্ষা করেছেন ভারতের পুলিশ অ্যাকশন থেকে।তিনি আরো বলেন, ‘এটি সত্যিই জিয়ার অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং দৃষ্টান্তমূলক উদ্যোগ, যা তিনি নভেম্বরের সেসব সংকটময় মুহূর্তে গ্রহণ করেছিলেন, অন্যথায় পুলিশ অ্যাকশনের নামে ভারতের হস্তক্ষেপ দেখা দিতে পারত।জিয়া মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে সামরিক বাহিনীর চেইন অব কমান্ডই কেবল ঠিক করেননি, সামরিক শাসনের সিংহাসনে থেকেও গণতন্ত্রের পতাকা উড়িয়েছিলেন।

নভেম্বর সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেনি বাংলাদেশে, ঘটেছিল এমনি একটি চেতনার অভ্যুদয়, যার পেছনে ছিল দেশ জাতির আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। আধিপত্যবাদের অন্ধকার ঠেলে নবসূর্যের সন্তান হিসেবে মুক্ত হয়ে এসেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মহান ঘোষক জিয়া। দিনটি বিপ্লবের কারণে যে, নতুন রাষ্ট্রচিন্তা, নতুন উৎপাদন চিন্তা, নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছুর বিচারবিবেচনার সূত্রপাত ঘটেছিল এই দিনে। জিয়া ছিলেন স্বাপ্নিক পুরুষ। দেশ নিয়ে, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা নিয়ে, দেশের জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে, জনসাধারণের দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে জিয়া যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তা সার্বিক অর্থে বিপ্লবী। দ্বিধাবিভক্ত প্রতিবেশ থেকে জাতীয় চিন্তাকে একই চিন্তাধারায় প্রবাহমানদানের জন্য নভেম্বরের ভূমিকা অনন্য। তাই নভেম্বরের বিপ্লব সংহতি দিবসকে সামনে রেখে এই দিনের লক্ষ্য আদর্শ পূরণের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। জাতীয় জীবনে নভেম্বরের তাৎপর্য উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বলেছেন, ‘সংহতি বিপ্লব দিবসের শিক্ষা আমাদের নিবেদিতপ্রাণ জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক জনগণকে আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক অর্থনৈতিক জীবনে আমূল পরিবর্তন আনার জন্য নতুন বিপ্লবের উচ্চতর লক্ষ্য অর্জনের প্রেরণার উৎস এবং নতুন মহিমান্বিত বিপ্লবের পূর্ণ সাফল্যের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, ত্যাগ ঐক্য অপরিহার্য।

 

১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধ আমাদের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা এনে দেয় বটে; কিন্তু স্বাধীনতা হয়ে পড়ে অনিরাপদ। নভেম্বরের বিপ্লব এই অনিরাপদ স্বাধীনতাকে নিরাপদ করে। অনিশ্চয়তার ঘনঘোর অন্ধকার কেটে যায় নভেম্বরের ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই। তাই বললে অত্যুক্তি হবে না যে, নভেম্বর আমাদের স্বাধীনতার নবজন্ম লাভ। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের পর আধিপত্যবাদী সম্প্রসারণবাদী গোষ্ঠী এবং তাদের দেশীয় এজেন্ট বারবার নভেম্বরের চেতনার ওপর আঘাত আনার চেষ্টা করেছে, তারা আমাদের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে চায়। বর্তমান বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক কারণে আমাদের দেশকে নিয়ে জাতীয়আন্তর্জাতিকভাবে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।

একটি উদার প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে বিশ্বের দরবারে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্বের স্বার্থে ইস্পাতকঠিন ঐক্যের ভিত্তিতে এই অপচেষ্টাকে প্রতিহত করতে হবে।দেশের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্বের স্বার্থে প্রতিটি নাগরিকই একজন সৈনিক’Ñ শহীদ জিয়ার এই বাণীই যুগ যুগ ধরে দেশের দেশপ্রেমিক জনগণকে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা করতে উদ্দীপ্ত করবে, অনুপ্রেরণা জোগাবে। শহীদ জিয়ার সৃষ্ট রৌদ্রকরোজ্জ্বল ইতিহাসের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থাকতেই হবে। যদি আমরা এই দায়বদ্ধতা হারাই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়ে উঠবে স্বার্থপর। আমাদের স্বাধীনতাসার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়বে। নভেম্বরের সিপাহীজনতার বিপ্লবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নাম। নভেম্বর বিপ্লবকে স্মরণ করতে গেলেই শহীদ জিয়ার নাম আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে আমাদের সামনে। ১৭৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর যে পরিণতি নেমে এসেছিল, ’৭৫এর সিপাহীজনতার বিপ্লব ব্যর্থ হলেও হয়তো দেশ জনগণের সেই পরিণতি হতো। নভেম্বর সিপাহীজনতার বিপ্লবের গভীর তাৎপর্য এখানেই।

]]>
কবরে যাবার পথটুকু কত দূর? http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a6%95%e0%a6%ac%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%aa%e0%a6%a5%e0%a6%9f%e0%a7%81%e0%a6%95%e0%a7%81-%e0%a6%95%e0%a6%a4-%e0%a6%a6%e0%a7%82%e0%a6%b0/ Sun, 01 Oct 2017 23:04:15 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=81833

হাবিব সরোয়ার আজাদ : কবরে যাবার পথটুকু আমার জীবন থেকে আর কতটুকু দূরত্বে রয়েছে? ফেসবুকে থাকা বন্ধুদের প্রতি রইল ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা। প্রতি বছরের ন্যায় ১ লা অক্টোবর ২০১৭ খ্রিস্টাব্দের দিনটি ছিল আমার জন্মদিন।’ কোন বছরই আনুষ্ঠানিকভাবে আমার জন্মদিন পালন করা হয়নি, আর হয়তো ভষিষ্যতেও পালন করা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করব।’

ফেসবুকে থাকা আমার বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, যারা আমার জন্ম দিন উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।’ ‘‘জন্মদিন পালন নিয়ে একটি কথা না বলইে পারছি না।

আসলে বছরের যে দিনটি আমার জন্য জন্মদিনের বার্তা বয়ে নিয়ে আসে ঠিক সেদিন-ই আমি চিন্তা করি শেষ ঠিকানা অর্থাৎ কবরে যাবার পথটুকু আমার জীবন থেকে আর কতটুকু দূরত্বে রয়েছে? কতটুকুন সময়-ই-বা আমার হাতে আছে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত? আর কতটুকু ঈমান-আমল নিয়েই বা যেতে পারব খোদার সান্নিধ্যে? ঠিক তখন মনে করি জন্মদিন পালনের নাম করে যে টাকাটা অপচয় বা ব্যয় করব ঠিক সেই পরিমাণ টাকা দিয়ে যদি কোন অসহায় মানুষকে জামা-কাপড় কিনে দেয়া, তাদেরকে এক বেলা ভালোভাবে আহার করানো, আর্থিক সহযোগিতা কিংবা কোন ভালো কাজে টাকা গুলো ব্যায় করা যায় তাহলে খোদা তাআলা আমার প্রতি রাজি খুশি হয়ে যাবেন।।

আমার অবশিষ্ট জীবনের সময়টুকু যেন আপনাদের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা নিয়ে সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকে সাদামাটা জীবন যাপন করেই কাঁটিয়ে যেতে পারি এই দোয়াটুকুই আপনাদের নিকট কামনা করছি বন্ধুগণ।। আমার এ কথা গুলো বা লেখাটা পড়ার পর হয়ত অনেকেই বিরক্তিবোধ করবেন এরপরও সবশেষে সবিনয়ে অনুরোধ করব আমার ভুল ত্রুটি হয়ে থাকলে আশা করি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।

]]>
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র ৭১ তম শুভ জন্মদিনে নাগরিকের পক্ষ থেকে খোলা চিঠি http://bangla.swadhindesh.com/%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%a8%e0%a7%80%e0%a7%9f-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%80-%e0%a6%b6%e0%a7%87%e0%a6%96/ Thu, 28 Sep 2017 07:03:04 +0000 http://bangla.swadhindesh.com/?p=81621

মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ ২৮ সেপ্টেম্বর আপনার শুভ জন্ম দিনে নাগরিকের পক্ষ থেকে আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। দেখতে দেখতে ৭০ বছর পেরিয়ে আপনি ৭১এ পা রাখলেন। দীর্ঘ ৭১ বছরে আপনার অর্জন অনেক। আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন আপনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। এদেশের সাধারণ নাগরিক আপনার কাছে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। তারা মনে করে আপনি সাধারণ জনগণের পক্ষে রয়েছেন। কিন্তু অতিব দুঃখের সাথে আপনার শুভ জন্মদিনে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নাগরিকে পক্ষ থেকে খোলা চিঠির মাধ্যমে আপনার প্রতি আমাদের আহ্বান। আপনার নিশ্চয় মনে আছে এদেশে গণতন্ত্রকে ও ভোটাধিকারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তৎকালীন ৯৬ সালে রাজপথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করেছিলেন। সেই সময়ে হরতাল, ধর্মঘট, অনশন, বিক্ষোভ মিছিল সহ নানামুখী আন্দোলন ও কৌশলের মধ্য দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদে আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং সেই সময়ে সাধারণ মানুষ তাদের ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছিল। আপনি ১/১১ সেই চরম দুঃশাসনের পর ক্ষমতায় এসে আপনার আন্দোলনের ফসল তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রক্রিয়া মহান সংসদে গলাটিপে হত্যা করলেন। সাধারণ মানুষ তাদের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো। দেশের আইনের শাসন ও নির্বাহী শাসনকে মুখোমুখী দাঁড় করালেন। সাধারণ মানুষ তাদের আইনের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে শুরু করলো। আপনি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধী দলের উপর শুরু হলো সীমাহীন অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপিড়ীন। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য, এম ইলিয়াস আলী ও তার ড্রাইভার, ঢাকা মহানগর বিএনপি যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ৫৬ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর চৌধুরী আলম, ৩৮ নং ওয়ার্ড (বর্তমান) ২৫ নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমন সহ একই দিনে ড্রাইবার কাওসার সহ আটজনকে গুম করা হলো। এ ভাবে গত দশ বছরে গুমের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে প্রায় তিনশতাধিক এর উপরে এই তালিকা চলে আসছে। সর্বশেষ ২০দলীয় জোটের শীর্ষনেতা, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান সহ পাঁচজন গুম হয়েছিল। আজকে আপনার শুভ জন্মদিনে খবরের পাশে আরেকটি শুভ খবর আমাদের হৃদয়ে আশা সঞ্চালিত হয়েছে। কারণ আমরা দেখতে পেলাম গুম হওয়া সরিষাবাড়ী পৌর মেয়র শ্রীমঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ভাবে উদ্ধারের তালিকা খুবই ছোট হলেও আমাদেরকে আশান্বিত করে যারা গুম হয়েছে, তারা হয়তো এভাবেই তাদের মায়ের কোলে ফিরে আসবে। প্রিয় জননেত্রী শেখ হাসিনা আপনি আপনার ৭১ তম জন্মদিনে দেশবাসীকে ভোট ও ভাতের অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের সেরা উপহার দিতে পারেন। আগামী একাদশ নির্বাচনে সকলের অংশ গ্রহণে একটি অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিয়ে জাতির কাছে চির স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে থাকতে পারেন। ক্রসফায়ারে নিহত খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নূরুজ্জামান জনির পুত্র নওহর, নূরুজ্জামানের মৃত্যুর তিন মাস পর পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখেছে। নওহর এখন খুবই অসুস্থ্য। তার মা মনিসা যখন ফেসবুকে লিখেছিল আমার নওহর কে নিয়ে হাসপাতালে সবার পাশে তাদের বাবা আছে কিন্তু নওহরের পাশে তার বাবা নেই। কথাটি আমার হৃদয়ে রক্ষক্ষরণ ঘটেছিল। আমি বিশ^াস করি আপনার হৃদয়েও প্রিয়জন হারানোর বেদনা রয়েছে। সেই বিষয় বিবেচনা করলেও অসহায় পরিবারের প্রতি সদয় দৃষ্টি দিয়ে গুম খুনের রাজনীতি কঠোর হস্তে দমন করে ইতিহাস হয়ে থাকতে পারেন। পরিশেষে আপনার প্রতি আবারও আকুল আবেদন। দেশে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়ে। দেশে বিদেশ থেকে অনেক ত্রাণ আসছে তাদের জন্য। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নের তাদেরকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা ও ত্রাণ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা প্রদান করা হচ্ছে। কিন্তু নিজেদের মধ্যে অনৈক্য ও পরস্পর পরস্পের প্রতি কাদা ছোড়া ছুড়ির রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধ করা না হলে রোহিঙ্গারা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য একটি মহা বিষ্ফোড়া হয়ে উঠতে পারে। রোহিঙ্গাদের পাশে বিএনপিসহ যারা দাঁড়িয়েছে তাদেরকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ না জানিয়ে সমলোচানমূলক কথা বলেন, তখন একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের কষ্ট হয়। দেশকে মহাদূর্যোগ থেকে রক্ষা করতে হলে জাতীয় ঐক্যের কোন বিকল্প নেই। দেশে এসে বিএনপি সহ সবাই ডেকে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে এ জাতিকে মুক্তিদিন এবং আপনার শুভ জন্মদিনে দেশবাসীকে গণতন্ত্র উপহার দেন। আপনি ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন, একজন নাগরিক হিসেবে শুভ জন্মদিনে এই আমাদের প্রার্থনা। লেখক : মোঃ মঞ্জুর হোসেন ঈসা মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার সমিতি।

]]>